সুমিতা রায়। ছবিটি তুলেছেন বিশ্বরুপ গাঙ্গোলি যা উইকিমিডিয়া কমন্সে সিসি-বাই-এসএ ৩.০ লাইসেন্সে প্রকাশিত।

ভারতের বিহারে বাঙালি পরিবারে ১৯৬৪ সালে জন্ম নেওয়া সুমিতা রায় ২০১৫ সালের জুলাই থেকে বাংলা উইকিপিডিয়াতে অবদান রাখছেন। তিনি ১৯৯৭ সালে প্রথম ভারতীয় মহিলা ট্রান্স হিমালয় অভিযানের আট সদস্যের ভারতীয় দলের সদস্য ছিলেন। এ অভিযানকে কোন মহিলা দলের প্রথম ট্রান্স হিমালয় অভিযান হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে। প্রকৌশল পেশা থেকে অবসর নেওয়ার পর এখন তিনি সময় পেলেই উইকিপিডিয়াতে অবদান রাখেন।

 

বাংলা উইকিপিডিয়াতে তাঁর সম্পাদনা সংখ্যা সাড়ে চার হাজারের বেশি, সকল উইকিপিডিয়া প্রকল্প মিলিয়ে তাঁর মোট সম্পাদনা সংখ্যা প্রায় ২৮ হাজার। বাংলা উইকিপিডিয়া তথা উইকিমিডিয়া প্রকল্পে তাঁর জড়িত হওয়াসহ নানা বিষয় নিয়ে উইকিবার্তার সাথে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অংকন ঘোষ দস্তিদার

উইকিবার্তা: প্রথমেই উইকিবার্তার পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা। উইকিপিডিয়ার সাথে আপনার যুক্ত হওয়ার গল্পটা শুনতে চাই। শুরুটা কিভাবে হয়েছিল?

সুমিতা: অনেক অনেক ধন্যবাদ। ঠিক বছরটা মনে নেই, একটি অ্যাকাউন্ট খুলেছিলাম, না বুঝতে পেরে আর কিছু করা হয়নি। দ্বিতীয়বার একজন ব্যবহারকারী, আমার তোলা রাজীব চকের পার্কের ভিতরের ছবি ফ্লিকার থেকে নেবার অনুমতি চেয়েছিলেন, অনুমতি দিয়ে, তখনো একবার মনে হয়েছিল যোগ দিই, কিন্তু হয়ে ওঠে নি। ২০১৫-তে উইকিম্যানিয়াতে যোগ দেওয়ার জন্য, ভিসা আবেদন করতে বোধিসত্ত্ব (উইকিপিডিয়ান বোধিসত্ত্ব মণ্ডল) আসে আমাদের দিল্লীর বাড়ীতে, সঙ্গে আসে নাহিদ সুলতান, ওদের উৎসাহ দেখে বেশ উৎসাহিত হই এবং ওঁদের উদ্যোগেই আমি যোগ দেই উইকিপিডিয়াতে।

উইকিবার্তা: কিভাবে উইকি জগতের প্রতি আগ্রহ তৈরি হল?

সুমিতা: ছবি তুলতে ভালোবাসি, তাই প্রথমত প্রয়োজনীয় ছবি উইকিমিডিয়াতে দেবো এইভাবেই আগ্রহের শুরু। তারপর যেমন যেমন করে পথ চলেছি উইকি জগতে মনে হয়েছে আরো বিষয়গুলিতেও আমি কিছু যোগদান করতে পারি; করে আসতে আসতে জড়িয়ে পড়েছি। যেমন: বিভিন্ন ভাষার পাতায় ছবি সংযোগ, বিষয়শ্রেণী, টেমপ্লেট নির্মাণ, তথ্যসূত্র যোগ, নিবন্ধ তৈরি, উইকিউপাত্তে সংযোগ আরো কত কি…

উইকিবার্তা: উইকিপিডিয়া তথা উইকিমিডিয়া প্রকল্পে আপনি কোন বিষয়গুলো নিয়ে সাধারণত কাজ করতে পছন্দ করেন?

সুমিতা: সাধারণত আমি জীবনী, বিজ্ঞান, ইতিহাস, পাহাড়, স্বাস্থ্য সব বিষয় নিয়ে, এসভিজি ফাইল বানাতে, উইকিউপাত্তে অবদান রাখতে, কমন্সে অবদান রাখতে ভালবাসি। আগে বেশ কিছুদিন উইকিসংকলনে ওসিআর-এর কাজ করেছি, সামান্য কিছু মুদ্রণ সংশোধনও করেছি, এখন আর হয়ে ওঠে না।

“ঘরের কাজের গতি আরো দ্রুত হয়ে যাবে, যখন আপনি নিজেকে রোজ নতুন করে আবিষ্কার করবেন উইকিপ্রকল্পে অবদানের মাধ্যমে”

উইকিবার্তা: সারা বিশ্বেই উইকিপিডিয়া কিংবা এর সহপ্রকল্পসমূহে নারীদের অংশগ্রহণের অভাব লক্ষ্যণীয়। আমাদের উপমহাদেশের সাপেক্ষে এই সমস্যা মোকাবেলার জন্য কী কী করা যেতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

সুমিতা: স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের কথা বলে বোঝাতে হবে যে সামাজিক মাধ্যমগুলিতে তাঁরা যে সময় দেন, সে সময়টুকুর খানিকটা যদি উইকির যেকোনো প্রকল্পতে দেন, সম্মিলিতভাবে মুক্ত জ্ঞানের প্রবাহে তিনিও হতে পারেন একজন কাণ্ডারি। আমাদের সবাইকে দরকার, জন্ম থেকে আমরা কিছু শিখে আসিনি, তাই একটু কম বা বেশি সময়ে আমরা যেকোনো বয়সে, উইকির প্রকল্পগুলিতে অবদান রাখা শুরু করতে পারি।

আমাদের নারীর মধ্যে সহজাত যে সহনশীলতা, দায়িত্ববোধ, একাগ্রতা আছে তাতে নিজের সংসারের পরিধিটাকে একটু বড় করে নিয়ে বিশ্বের দরবারে নিজেকে একজন বিশ্বকোষের যোগ্য অবদানকারী হিসাবে উপস্থাপন করতে পারি।

এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে যাবার পথে ফোরটসেতে সুমিতা রায়। ছবি: গৌতম দত্ত/সিসি-বাই-এসএ ৪.০

উইকিবার্তা: ভবিষ্যতে ভারত এবং বৈশ্বিক পরিসরে উইকিমিডিয়া আন্দোলন নিয়ে কী ধরণের পরিকল্পনা আছে?

সুমিতা: আমাদের মাতৃভাষার জন্য যেমন কাজ করতে হবে, তেমনই দেশ তথা বিশ্ব আঙ্গিকে উইকিমিডিয়া আন্দোলনে যুক্ত হতে হবে। জগত যত মুক্ত জ্ঞানের আদানপ্রদানও তত সহজ। যেভাবে হাতে হাত মিলিয়ে দুই বাংলা কাজ করছে ঠিক সেইভাবেই সারা বিশ্বজুড়ে প্রকল্পে যুক্ত হতে হবে। গতবারের মত এবারেও ব্যাঘ্রপ্রকল্প হবে শুনেছি, ফেব্রুয়ারিতে আন্তর্জাতিক উইকি লাভ্‌স লাভ ছবি প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে, সঙ্গে লিঙ্গবৈষম্য কমাতে নিবন্ধ তৈরির অভিযান, বাংলা ভাষা দিবস, ভেক্টর ছবিতে নিজ নিজ ভাষায় লেবেল যোগ আরো কত কি। সমস্ত অবদানকারীকে অনুরোধ করব এই প্রকল্পগুলিতে সক্রিয়ভাবে যোগ দিন আর নতুনদের শেখানোর জন্য পাশে থাকুন।

নারীদের জন্য আরো একটি কথা – আপনি চাকুরীরতা বা গৃহবধু এটিই আপনার মূল পরিচয় নয়, আপনার মূল পরিচয় হোক পরিবার পালনের সাথে সাথে আপনি একজন মুক্ত জ্ঞানের ধারক ও বাহক

উইকিবার্তা: পূর্বের কোনো কাঙ্ক্ষিত উইকিপ্রকল্প বাস্তবায়নে কি বাধার সম্মুখীন হয়েছেন? সম্মুখীন হলে কী ধরণের বাধা? কীভাবে সমস্যার মোকাবেলা করেছেন?

সুমিতা: স্থানীয় আয়োজক হিসাবে আমার প্রথম প্রকল্প ব্যাঘ্র প্রকল্প ২০১৮, সহ-আয়োজক মৌর্য্যের সাথে। প্রথমে আশাহত হয়েছিলাম সক্রিয় অবদানকারী কম দেখে। তাই প্রকল্পের সময় আর পরবর্তী সময়েও আমার অন্যতম নেশা ছিল নতুন অবদানকারীকে অনলাইনে সাহায্য করে যাওয়া যখনই সমস্যা হবে। যেমন বিষয়বস্তু অনুবাদে, বিষয়শ্রেণী তৈরিতে, তথ্যসূত্র যোগে ইত্যাদিতে।

উইকিবার্তা: আমাদের উপমহাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে দেখা যায় একটা নির্দিষ্ট বয়সের পর নারীরা হয়ত নানান কারণে বেশ ব্যস্ত হয়ে পড়েন সংসার নিয়ে। সেক্ষেত্রে আপনি ব্যতিক্রম। আপনার মতন যাঁরা আছেন, তাঁদের উদ্দেশ্যে আপনার কী পরামর্শ থাকবে?

সুমিতা: বয়স একটা মানসিক ব্যাপার — পঞ্চাশোর্ধ বয়সে এখনো আমি সংসার সামলে নতুন কিছু শিখতে আর শেখাতে, আর উইকিপিডিয়াতে অবদান রাখতেও সমান আগ্রহী। ঘরের কাজের গতি আরো দ্রুত হয়ে যাবে, যখন আপনি নিজেকে রোজ নতুন করে আবিষ্কার করবেন উইকিপ্রকল্পে অবদানের মাধ্যমে। সেন্টার ফর ইন্টারনেট সোসাইটির অবদান আছে ভারতীয় উইকি অবদানকারীদের অবদানের ও নেতৃত্ব অবদানের সুপ্ত গুণগুলিকে ঘষে মেজে ঔজ্জ্বল্য আনাতে। অবশ্যই বাংলা উইকি সম্প্রদায়ের সমর্থন অনস্বীকার্য।

নারীদের জন্য আরো একটি কথা – আপনি চাকুরীরতা বা গৃহবধু এটিই আপনার মূল পরিচয় নয়, আপনার মূল পরিচয় হোক পরিবার পালনের সাথে সাথে আপনি একজন মুক্ত জ্ঞানের ধারক ও বাহক।

উইকিবার্তা: বাংলা উইকির উন্নতিকল্পে এই মুহূর্তেই প্রয়োজনীয় কোনো পদক্ষেপ নেয়ার কথা বলতে বললে আপনি কোন পদক্ষেপের কথা বলবেন?

সুমিতা: দুই বাংলা একতারায় নিজেদের যেভাবে বেঁধে রেখেছেন, সেইভাবে দলগত নিঃস্বার্থ উদ্যোগ জারী থাকুক, নতুন অবদানকারীদের সমানে শেখানো চলুক আর পুরানো অবদানকারী যাঁরা কোনো কারণে অবদান রাখছেন না তাঁদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হোক।

উইকিবার্তা: সুমিতা, আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

সুমিতা: উইকিবার্তাকেও ধন্যবাদ।

Translate »
Share This