দেশের অবস্থান চিহ্নিত করছেন। ছবি: ZI Jony

উইকিম্যানিয়া ২০২৫, নাইরোবি — এটি কেবল একটি বৈশ্বিক সমাবেশ নয়, বরং এটি ছিল অবদান রাখার, শেখার এবং উইকিমিডিয়া আন্দোলনের ভেতর অর্থবহ সম্পর্ক গড়ে তোলার এক অসাধারণ সুযোগ। আমার কাছে এই সম্মেলন হয়ে উঠেছিল এমন একটি জায়গা, যেখানে বিশ্বের নানা প্রান্তের স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ একত্রিত হয়েছিল এক অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ও সম্মিলিত প্রভাব নিয়ে।

এই ব্লগে আমি শেয়ার করছি আমার অভিজ্ঞতার সবচেয়ে স্মরণীয় ও ভাবনাজাগানিয়া মুহূর্তগুলো, যা আমি উইকিম্যানিয়া ২০২৫-এ অনুভব করেছি।

নাইরোবির পথে

উইকিম্যানিয়া নাইরোবি ছিল আমার প্রথম উইকিম্যানিয়া এবং একই সঙ্গে প্রথম বিদেশ ভ্রমণ। বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের নানা অভিজ্ঞতা শুনে প্রথমে কিছুটা শঙ্কা থাকলেও প্রস্তুতি ছিল নিখুঁত—টিকা ও সকল কাগজপত্র আগে থেকে ঠিক করে রেখেছিলাম। শেষ পর্যন্ত সবকিছু মসৃণভাবেই সম্পন্ন হয়, এবং আমি নতুন এক অধ্যায়ে পা রাখি—পূর্ব আফ্রিকার উষ্ণ আতিথেয়তা ও বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে। আমাদের ট্রানজিট ছিল দুবাইয়ে, সেখানে দেখা হয়ে যায় বেশ কয়েকজন নেপালী উইকিমিডিয়ানের সাথে, আমরা একই বিমানে নাইরোবি পৌঁছাই।

প্রাক-সম্মেলনের বিশেষ আয়োজন

উইকিম্যানিয়া ২০২৫-এর অন্যতম উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল “Extended Rights Users Pre-Conference Session” — এটি ৫ আগস্ট অনুষ্ঠিত এক অনন্য সমাবেশ, যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আগত প্রশাসক ও উচ্চতর অধিকারধারীরা একত্রিত হয়েছিলেন নাইরোবির নভোটেল নাইরোবি ওয়েস্টল্যান্ডস হোটেলে।

ক্রমবর্ধমান মিস ইনফরমেশন, ডিস ইনফরমেশন, ভ্যান্ডালিজম এবং নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলার প্রয়োজনীয়তা থেকেই প্রথমবারের মতো এ ধরনের একটি সম্মেলন আয়োজন করা হয়। উইকিমিডিয়া ফাউন্ডেশন কর্তৃক আয়োজিত এই সেশনের মূল লক্ষ্য ছিল অভিজ্ঞতা বিনিময়, পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, এবং বৈশ্বিক পর্যায়ে জ্ঞানভিত্তিক প্ল্যাটফর্মকে নিরাপদ রাখার কৌশল নিয়ে আলোচনা।

উইকিম্যানিয়া ২০২৫-এর দ্বিতীয় দিন। ছবি: ZI Jony

বাংলাদেশ থেকে উচ্চতর অধিকার থাকার কারণে আমি ও রকি ভাই এতে অংশগ্রহণের সুযোগ পাই। আমরা একাধিক সেশনে অংশ নিই, যেখানে নীতিগত সিদ্ধান্ত, ব্যবহারকারী সুরক্ষা ও কমিউনিটি গভর্ন্যান্স সম্পর্কিত নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে।

সম্মেলনের দিনগুলো

উইকিম্যানিয়া ২০২৫ চলাকালীন আমি অংশ নিয়েছি অসংখ্য সেশনে। ব্যক্তিগতভাবে আমার সবচেয়ে বেশি আগ্রহ ছিল উইকিউপাত্ত এবং ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্য (Misinformation/Disinformation) নিয়ে হওয়া আলোচনা সেশনগুলোতে।

এছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)-নির্ভর একাধিক সেশনে অংশ নিই, যেখানে বক্তারা তুলে ধরেন—AI কীভাবে উইকিমিডিয়া প্রকল্পগুলোর উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে, এবং কোথায় এটি নতুন নৈতিক ও কারিগরি চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে।

তবে শুধুমাত্র মূল সেশন নয়, আমার কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল প্রতিদিনের সেশনগুলোর বিরতিতে এবং সম্মেলন শেষে অনুষ্ঠিত সাইড ইভেন্ট, মিটআপ ও ডিনার পার্টিগুলো। এই অনানুষ্ঠানিক পরিবেশগুলোয় সমমনা উইকিমিডিয়ানদের সঙ্গে মতবিনিময়, নেটওয়ার্কিং এবং নতুন নতুন আইডিয়া বিনিময়ের সুযোগ পেয়েছি। অনেকের সঙ্গেই প্রথমবারের মতো সরাসরি দেখা হয়েছে—যাদের সাথে দীর্ঘদিন ধরে অনলাইনে কাজ করেছি।

স্টুয়ার্ডস মার্টিন এবং আমি । ছবি: ZI Jony

প্রতিদিনের যাতায়াতও ছিল এক রকম অ্যাডভেঞ্চার! আমার হোটেল নভোটেল নাইরোবি ওয়েস্টল্যান্ড থেকে মূল কনফারেন্স ভেন্যু ছিল বেশ দূরে, ফলে প্রতিদিন আসা-যাওয়া করে এতো এতো কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ বেশ চ্যালেঞ্জিং ছিল। কিন্তু প্রতিটি দিনই শেষ হয়েছে পরিপূর্ণ তৃপ্তি নিয়ে।

নাইরোবি ও পূর্ব আফ্রিকার অভিজ্ঞতা

সম্মেলনের বাইরে নাইরোবি নিজেই ছিল এক জীবন্ত অভিজ্ঞতা। পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে পুনর্মিলন, নতুন সম্পর্কের সূচনা, এবং স্থানীয় সংস্কৃতি অন্বেষণ—সব মিলিয়ে দিনগুলো ছিল রঙিন ও সমৃদ্ধ।

সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তগুলোর মধ্যে একটি ছিল নাইরোবি ন্যাশনাল পার্কে সাফারি। শহরের কাছেই এমন বন্যপ্রাণে ভরা প্রাকৃতিক অভয়ারণ্য দেখে অভিভূত হয়েছি। কাছ থেকে জিরাফ, জেব্রা, হরিণ, এমনকি সিংহও দেখেছি—যা ছিল এক জীবন্ত ডকুমেন্টারি দেখার মতো অভিজ্ঞতা।

এর পাশাপাশি ঘুরেছি নাইরোবি ন্যাশনাল মিউজিয়াম এবং সংলগ্ন স্নেক পার্কে—যেখানে কেনিয়ার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জীববৈচিত্র্যের এক চমৎকার সংমিশ্রণ রয়েছে। বিভিন্ন সরীসৃপ ও বিষধর সাপের প্রদর্শনী যেমন রোমাঞ্চিত করেছে, তেমনি মিউজিয়ামের ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো জানার অভিজ্ঞতাও ছিল গভীরভাবে শিক্ষণীয়।

আরেকটি অসাধারণ অভিজ্ঞতা ছিল জিরাফ সেন্টার ভ্রমণ। এখানে প্রথমবারের মতো কাছ থেকে Rothschild’s giraffe দেখা—এমনকি তাদের খাওয়ানোর সুযোগও পেয়েছি। এত কাছ থেকে এই শান্ত স্বভাবের প্রাণীগুলোকে দেখা ছিল সত্যিই আনন্দদায়ক এবং অবিস্মরণীয়।

পূর্ব আফ্রিকায় এই প্রথম ভ্রমণ আমার জন্য হয়ে উঠেছিল এক অনন্য সাংস্কৃতিক অভিযাত্রা, যা আমার উইকিম্যানিয়া অভিজ্ঞতায় যোগ করেছে নতুন এক মাত্রা।

উইকিম্যানিয়া ২০২৫ – প্রথম দিনে স্বাক্ষর প্রদান। ছবি: ZI Jony

উইকিম্যানিয়া ২০২৫ সম্ভব হতো না যদি না স্থানীয় উইকিমিডিয়ানরা, কোর অর্গানাইজিং টিম, উইকিমিডিয়া ফাউন্ডেশন, এবং অসংখ্য স্বেচ্ছাসেবক অক্লান্ত পরিশ্রম না করতেন। তাদের প্রতিটি প্রচেষ্টা এই আয়োজনকে করেছে নিখুঁত ও স্মরণীয়।

উইকিবার্তা
Translate »
Share This