জিমি ওয়েলসের সাক্ষাৎকার। ছবি: ইয়াহিয়া

বৈশ্বিক জ্ঞান বিনিময়ের সবচেয়ে বড় আসর ‘উইকিম্যানিয়া’। গেলো আগস্টে কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবিতে অনুষ্ঠিত উইকিমিডিয়ার এই বার্ষিক সম্মেলনে যখন বিশ্বের নানা প্রান্তের সম্পাদক ও স্বেচ্ছাসেবকরা নিজ নিজ ভাষার জ্ঞানভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করার পরিকল্পনায় ব্যস্ত, তখনই এক ফাঁকে বাংলা সম্প্রদায়ের সঙ্গে মিলিত হন এই মুক্ত বিশ্বকোষের সহ-প্রতিষ্ঠাতা জিমি ওয়েলস। আলাপচারিতায় উঠে আসে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ, তার দীর্ঘদিনের বন্ধু ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং বাংলা উইকিপিডিয়ার অগ্রগতি ও সম্ভাবনা। 

জিমি ওয়েলসের সাথে দক্ষিণ এশীয় উইকিমিডিয়ানদের একটি দল।

জিমির কাছে উইকিপিডিয়ার মূল শক্তি হলো এর বৈশ্বিক সম্প্রদায়গুলো। নাইরোবিতেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি, যেখানে বাংলা উইকিপিডিয়ানদের প্রাণবন্ত উপস্থিতি তাকে বিশেষভাবে মুগ্ধ করে। হাসিমুখে তিনি বলেন, “এখানকার প্রাণোচ্ছল বাংলা উইকিপিডিয়ানদের দেখে আমার দারুণ লাগছে। আপনারা চমৎকার সব টি-শার্ট পরেছেন! আমরা এখানে সবাই মিলে দারুণ মজা করছি।”

বাংলা উইকিপিডিয়ার বর্তমান অবস্থান তুলে ধরে তিনি বলেন, “ভাষাভাষীর সংখ্যার তুলনায় বাংলা উইকিপিডিয়া এখনও ছোট, কিন্তু এর দ্রুত বিকাশ অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।” এই অগ্রযাত্রাকে তিনি উইকিপিডিয়ার বৃহত্তর স্বপ্নের অংশ হিসেবে দেখেন।

তাঁর মতে, “উইকিপিডিয়ার বয়স এখন প্রায় ২৫ বছর। আমার আশা, আগামী ২৫ বছরের মধ্যে আমরা আমাদের সেই চূড়ান্ত স্বপ্ন, বিশ্বের প্রতিটি মানুষের কাছে তার নিজের ভাষায় একটি পূর্ণাঙ্গ মুক্ত বিশ্বকোষ পৌঁছে দেওয়ার মতো কাজটি বাস্তবায়ন করতে পারব।”

উইকিপিডিয়া আন্দোলনকে টেকসই করতে, বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নতুন সম্প্রদায়গুলোর জন্য জিমি ওয়েলস কিছু পরামর্শ দেন। এরমধ্যে একটি ছিল নতুন সম্পাদকদের প্রতি আন্তরিক হওয়া প্রসঙ্গে। সক্রিয় উইকিপিডিয়ানদের উদ্দেশ্যে  তিনি বলেন, “নতুনদের দিকে মনোযোগ দিন। কেউ একটি সম্পাদনা করলে তার আলাপ পাতায় গিয়ে লিখুন, ‘আপনার সম্পাদনার জন্য ধন্যবাদ! খুব ভালো লাগল।’ তাকে অন্যান্য অভিজ্ঞদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিন। কারণ নতুনরা আন্তরিক বার্তা পেলে মানুষ উইকিপিডিয়াকে নিছক একটি ওয়েবসাইট না ভেবে, একটি মানবিক ও সহযোগিতাপূর্ণ সম্প্রদায় হিসেবে অনুভব করবে।”

উইকিমিডিয়া বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের ভূমিকা নিয়ে তিনি বলেন, “চ্যাপ্টারের একটি বড় কাজ হলো স্থানীয় গ্যালারি, গ্রন্থাগার, আর্কাইভ, জাদুঘর ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে অংশীদারিত্ব তৈরি করা। এর মাধ্যমে উইকিপিডিয়ার তথ্যভাণ্ডার আরও সমৃদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য হবে।

আজকের ভুল তথ্য, অপপ্রচার ও রাজনৈতিক মেরুকরণের যুগে উইকিপিডিয়ানদের নিরপেক্ষ ভূমিকার ওপর তিনি বিশেষভাবে জোর দেন। তিনি বলেন, “মিডিয়ার কাছে আমাদের সঠিকভাবে তুলে ধরতে হবে। তাদের বোঝাতে হবে আমরা ফেসবুক বা টিকটক নই। আমরা চিন্তাশীল ও সহযোগিতাপূর্ণ একটি আন্দোলন। আমাদের নিরপেক্ষ কাজের ধারা সাংবাদিকদের জন্যও অনুপ্রেরণা হতে পারে।”

উইকিম্যানিয়া ২০২৫-এ জিমি এবং দেলোয়ার। ছবি: মাসুম আল হাসান

এর আগে আলাপচারিতার শুরুতে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কথা উঠতেই জিমি ওয়েলসের কণ্ঠে উঠে আসে আন্তরিকতা ও স্মৃতিচারণ । তিনি বলেন, “ইউনূস সাহেবের কথা বললে অনেক কথা মনে পড়ে। তিনি শুধু নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী নন, ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত উজ্জ্বল, প্রাণবন্ত ও দয়ালু একজন মানুষ। তার কাজ আমাকে অনুপ্রাণিত করে।”

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ড. ইউনূসের অবস্থান নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করলেও হাল ছাড়তে নারাজ। ওয়েলস বলেন, “আমি বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে সরাসরি মন্তব্য করতে চাই না। শুধু এটুকুই চাই, চিন্তাশীল মানুষেরা শান্তিপূর্ণভাবে একসঙ্গে কাজ করুক। বর্তমান পরিস্থিতিতে তাকে কিছুটা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হলেও আমি আশাবাদী, তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আরও উঁচু স্তরে পৌঁছাবে এবং একটি সহনশীল ও শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাবে।”

এই প্রসঙ্গে তিনি বাংলাদেশ সফরের স্মৃতিচারণ করে বলেন, “আমার ঢাকা সফরটি ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত, ২৪ ঘণ্টারও কম! সেই তাড়াহুড়োর মধ্যেও কয়েকজন উইকিপিডিয়ানের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ হয়েছিল। তবে অতৃপ্তি রয়ে গেছে। ড. ইউনূস আমাকে পুনরায় আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। সবকিছু ঠিক থাকলে হয়তো আগামী গ্রীষ্মে পরিবারসহ বাংলাদেশে আসার চেষ্টা করব।

জিমির সঙ্গে এ আলাপচারিতায় প্রতিবেদক ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বাংলা উইকিপিডিয়ার প্রশাসক মাসুম আল হাসান রকি, উইকিমিডিয়া স্টুয়ার্ড মুহাম্মদ ইয়াহিয়া, উইকিমিডিয়ান দোলন প্রভা, নেট্টিমি সুজাতা, অনুপ সাদি, মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান প্রমুখ।

উইকিবার্তা
Translate »
Share This