উইকিম্যানিয়া ২০২৫-এর গ্রুপ ছবি। ছবি: Wikimedia Foundation

উইকিম্যানিয়া – উইকিমিডিয়ানদের সবচেয়ে বড় বার্ষিক সম্মেলন, যেখানে পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আসা স্বেচ্ছাসেবীরা একত্র হন জ্ঞান, সংস্কৃতি, এবং মুক্ত জ্ঞানের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করতে। ২০২৫ সালে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় আফ্রিকার প্রাণকেন্দ্র নাইরোবিতে। এটি ছিল আমার দ্বিতীয়বারের মতো সশরীরে অংশ নেওয়া উইকিম্যানিয়া, প্রথমবার ছিল সিঙ্গাপুরে ২০২৩ সালে।

নাইরোবির পথে

সিঙ্গাপুরে প্রথমবারের মতো উইকিম্যানিয়ায় অংশ নেওয়ার পর থেকেই আমি আফ্রিকায় আয়োজিত ম্যানিয়ায় অংশ নেওয়ার জন্য বিশেষভাবে আগ্রহী ছিলাম। মাঝখানে পোল্যান্ডে অনুষ্ঠিত উইকিম্যানিয়া ২০২৪-এর জন্য স্কলারশিপ পেলেও ভিসা জটিলতার কারণে অংশ নিতে পারিনি। নাইরোবি ছিল আমার জন্য অনেকটা প্রতীক্ষার ফল।

আমার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল দেখতে চাওয়া, আমাদের মতো অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটের একটি দেশ কীভাবে সফলভাবে এত বড় আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজন করে এবং কীভাবে স্থানীয় সম্প্রদায়গুলোকে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত রাখে।

মাসুম আল হাসান রকি। ছবি: Ssemmanda will

আমার উপস্থাপনাগুলো

নাইরোবি উইকিম্যানিয়ায় আমি দুটি উপস্থাপনা করার সুযোগ পেয়েছিলাম —

  1. লাইটেনিং টক: প্রথমটি ছিল লাইটেনিং টক Empowering Through Decentralization: The Case of Wikimedia Bangladesh। এখানে আমি আলোচনা করেছি কীভাবে উইকিমিডিয়া বাংলাদেশ শুরু থেকেই ঢাকা-কেন্দ্রিকতা ভেঙে সারা দেশে স্থানীয় সম্প্রদায় গড়ে তুলছে, যেমন রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ও চট্টগ্রামে। আমি তুলে ধরেছি কীভাবে বিকেন্দ্রীকরণ শুধু অংশগ্রহণ বাড়ায় না, বরং নেতৃত্ব গঠনে ভূমিকা রাখে।
  2. পোস্টার প্রেজেন্টেশন: দ্বিতীয়টি ছিল “বাংলার প্রেমে উইকি ২০২৫” এর উপরে পোস্টার প্রেজেন্টেশন। এটি ছিল বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও জ্ঞানের প্রতি আমাদের ভালোবাসা তুলে ধরার প্রচেষ্টা। পোস্টারে দেখানো হয় কিভাবে “বাংলার প্রেমে উইকি” মাধ্যমে সমগ্র বাংলা জুড়ে আলোকচিত্রের মাধ্যমে একটি আর্কাইভ তৈরি করতে সেটি কীরকম ভূমিকা রাখছে। 

এই উপস্থাপনাগুলোর মাধ্যমে আমি শুধু বাংলাদেশের কাজ তুলে ধরিনি, বরং সারা বিশ্বের উইকিমিডিয়ানদের সঙ্গে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ পেয়েছি।

অভিজ্ঞতা ও শেখা

নাইরোবির ম্যানিয়া আমার কাছে ছিল এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা। আফ্রিকার উষ্ণ আতিথেয়তা, স্বেচ্ছাসেবীদের পেশাদারিত্ব এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের আন্তরিকতা আমাকে মুগ্ধ করেছে। সেশনগুলোতে অংশ নিয়ে বুঝেছি, উইকিমিডিয়া আন্দোলন কেবল জ্ঞান ভাগাভাগি নয়, এটি এক বৈশ্বিক সংহতির প্রতীক।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ছিল, সীমিত সম্পদেও কিভাবে বড় প্রভাব তৈরি করা যায়। আফ্রিকার কমিউনিটিগুলো যে নিষ্ঠা, উদ্ভাবন আর স্থানীয় সম্পৃক্ততা দেখিয়েছে, তা ভবিষ্যতের জন্য আমাদের জন্য এক মূল্যবান উদাহরণ।

এবার ম্যানিয়াতে ৮টি ভেন্যুতে সমান্তরালভাবে বিভিন্ন সেশন আয়োজিত হয়েছে। এবার আমি মূলত গ্ল্যাম ও পার্টনারশিপ কেন্দ্রিক সেশনগুলোতে বেশি অংশ নেয়ার চেস্টা করেছি। সেসব থেকে বুঝেছি আমাদের প্রচুর কাজের সুযোগ রয়েছে এবং সেসব কাজ করার জন্য আমাদের যথেষ্ট উদ্যমী স্বেচ্ছাসেসক রয়েছে, প্রয়োজন শুধু যথাযথ উদ্যোগ নেয়া এবং কাজের পরিবেশ তৈরি করা। 

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে

উইকিমিডিয়া বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ডে নাইরোবির অভিজ্ঞতা নতুন দিক নির্দেশনা দেবে বলে আমি বিশ্বাস করি। বিশেষ করে আঞ্চলিক কমিউনিটি শক্তিশালী করা, নারী নেতৃত্ব বিকাশ, এবং স্থানীয় অংশীদারিত্ব বাড়ানোর ক্ষেত্রে আফ্রিকার উদাহরণ আমাদের অনুপ্রেরণা জোগাবে।

নাইরোবি শহরের অভিজ্ঞতা

কনফারেন্সের ব্যস্ততার মাঝেও আমি সময় বের করে নাইরোবি শহরটি ঘুরে দেখেছি। শহরটি প্রাণবন্ত ও পরিপাটি।
সবচেয়ে স্মরণীয় ছিল নাইরোবি ন্যাশনাল পার্কে যাওয়া, শহরের ভেতরেই এমন একটি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য সত্যিই অবিশ্বাস্য! সকালবেলায় সাফারিতে বেরিয়ে সিংহ, জিরাফ, জেব্রা আর গণ্ডারের দেখা পাওয়া ছিল জীবনের এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা। আরেকদিন গিয়েছিলাম জিরাফ সেন্টারে, যেখানে জিরাফদের এত কাছ থেকে খাওয়ানোর সুযোগ পেলাম যে, মনে হচ্ছিল প্রকৃতির সঙ্গে এক অদ্ভুত বন্ধন তৈরি হয়েছে।

স্নেক পার্কে নিজের ঘাড়ের উপরে সাপ নেয়া ছিল অন্যরকম এক অভিজ্ঞতা। ছবি: ইয়াহিয়া

এছাড়া কেনিয়ার জাতীয় যাদুঘরে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। যেখানে ট্যাক্সিডার্মি করা আফ্রিকান অনেক প্রাণী সাজানো ছিল, যেগুলো দেখতে জীবন্ত প্রাণীর চেয়ে কোন অংশে কম না। জাদুঘরের ঠিক পাশেই ছিল স্নেক পার্ক ও অ্যাকুরিয়াম, সেখানে বিভিন্ন প্রজাতির সাপ ও মাছ দেখতে পেয়েছিলাম আমরা।

শিখেছি, অনুপ্রাণিত হয়েছি

উইকিম্যানিয়ার প্রতিটি সেশন, প্রতিটি আলাপচারিতা আমাকে নতুন করে ভাবিয়েছে, কীভাবে আমরা মুক্ত জ্ঞানের আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করতে পারি। আফ্রিকাসহ অন্যান্য সম্প্রদায়ের উদ্যম, তাদের স্থানীয় সম্পৃক্ততা, এবং সীমিত সম্পদে বড় কাজ করার সক্ষমতা সত্যিই অনুপ্রেরণামূলক।

এই অভিজ্ঞতা থেকে অর্জিত অনুপ্রেরণা ও শিক্ষা ভবিষ্যতে উইকিমিডিয়া বাংলাদেশের কর্মকাণ্ডে আরও নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।

উইকিবার্তা
Translate »
Share This