
নাইরোবি জাতীয় উদ্যানে হাতির দাঁতের ছাই। ছবি: Nettime Sujata
খুব ছোট বেলায় যখন ভূগোল পড়ার বয়স হয়নি তখনই এক বন্ধুর মুখে কেনিয়া নামটা শুনেছিলাম, ওর বাবা সেখানে চাকরি করতেন। ওর কাছে গল্প শুনে দেশটা সম্বন্ধে একটা ভালো লাগা জন্মেছিল। এই বয়সে এসে হঠাৎই সেই স্বপ্নের দেশে যাবার একটা সুযোগ এসে গেল।
মার্চের এক সকালে উইকিম্যানিয়ার সংগঠক দলের কাছ থেকে এক ই-মেইল পেলাম; আমি সম্পূৰ্ণ বৃত্তিসহ নাইরোবিতে উইকিম্যানিয়া ২০২৫ এ যোগ দেবার জন্য নির্বাচিত হয়েছি। আমার তো আনন্দের সীমা ছিলনা। যাওয়ার আগে অনেক প্রস্তুতি ছিল, কনফারেন্স তো মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল অবশ্যই, তা বলে কি জঙ্গল ভ্রমণ বাদ যাবে? এযে অনেক দিনের স্বপ্ন। আস্তে আস্তে জানা গেল কারা কারা নির্বাচিত হয়েছেন। সকলকে নিয়ে গ্রুপ তৈরি হল। বাংলাদেশ থেকে যে বাঙালিরা যাচ্ছিলেন সেই পাঁচজনের সঙ্গে ভারত থেকে আমারও একটা বাংলা গ্রুপ তৈরি হলো। জনে জনে জানতে চাইলাম জঙ্গল সাফারিতে কে আগ্রহী। বিশেষ একটা সাড়া পেলাম না। সংগঠক দল কিছু ভ্রমণ সঙ্গীর ঠিকানা দিয়েছিলেন, সেখানে ই-মেইল করেও যুৎসই উত্তর পেলাম না। মনটা খারাপ হয়েই যাচ্ছিল। হঠাৎ যাত্রা শুরুর দিন দশেক আগে বাংলা গ্রুপে জিল্লুর রহমান জানালেন সাফারির একটা সূত্র পাওয়া গেছে। তবে স্বপ্নের মাসাইমারা হবেনা, নাইরোবি শহরেই নাইরোবি পার্কে যাবার একটা ব্যবস্থা হতে পারে। তাই সই, জঙ্গলের স্বাদ তো পাওয়া যাবে!
ভারত থেকে দিল্লি হয়ে নাইরোবির জোমো কেনিয়াট্টা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যখন নামলাম তখন আমাদের দেশের হিসেবে রাত হয়ে গেলেও ওখানে সবে সন্ধ্যে হয়েছে। নাইরোবির সময় ভারতের থেকে সাড়ে তিন ঘন্টা পেছনে। আমাদের জন্য বাস ছিল, তবে হোটেলে পৌঁছোতে রাত হল। আমার বাংলাদেশী বন্ধুরা তখনও এসে পৌঁছোন নি। তবে গ্রুপ মারফৎ খবর পেয়েছি আমাদের সাফারি হচ্ছে, পরেরদিন ভোরে। সেদিন প্রি কনফারেন্সের দিন। সুতরাং আমার তেমন কোন কাজ নেই, তবে উইকি উইমেন সামিটের সকালের কার্যক্রমে যোগদান একটু বাদ যাবে। হোটেল থেকে ডলার ভাঙিয়ে কেনিয়া শিলিং নিয়ে পরের দিনের খরচের জন্য প্রস্তুত থাকলাম। বিনিময় হার একটু বেশিই পড়ল। কিন্তু কি আর করা যাবে, এত রাতে আর কোথায় যাবো।
আমাদের সাফারি শুরু হতে একটু দেরি হয়েছিল, আমরা একসাথে দুটো জিপ নিয়ে বেরোলাম। কিন্তু পথে আর কোন বিঘ্ন ঘটেনি। নাইরোবি সাফারি পার্কে পৌঁছে কিছু ছবি তোলা হচ্ছিল, মাসাই পোসাক পরা কয়েকজন দাবী করলেন তাঁদের ছবি তোলা হয়েছে, সেই হিসেবে তাঁদের কিছু পাওনা হয়। দেওয়া গেল কিছু শিলিং, যে দেশের যা দস্তুর!
সাফারি পার্কে ঢোকার পর গাড়ির চালক গাড়ির ছাদটা ওপরে তুলে দিলেন, অর্থাৎ ওপরটা বেশ খানিকটা ফাঁকা হয়ে গেল দেখার সুবিধার জন্য। আমি তো সোজা জুতো খুলে সিটের ওপর দাঁড়িয়ে পড়লাম। তারপর দেখলাম দুটো গাড়ির মোটামুটি সকলেই তাই করেছেন। নাম না জানা পাখি অনেক দেখলাম। একটি বাজ পাখির কেরামতি চাক্ষুষ করলাম। তার মুখের খাবার মাটিতে পড়ে যাচ্ছিল, মাটিতে পড়ার অনেক আগেই সে সেটাকে ছোঁ মেরে আবার মুখে তুলে নিলো। কিছুটা এগিয়ে এক জায়গায় ছোট ঢিবি মতো দেখলাম। বোর্ড পড়ে জানা গেল চোরা শিকারিদের হাত থেকে উদ্ধার করা হাতির দাঁত এখানে পুড়িয়ে ফেলা হয়, যাতে কোন ভাবেই কেউ এর কালোবাজারি না করতে পারে। সেই ছাই এখানে ঢিবি করে রাখা হয়েছে। যেতে যেতে অসংখ্য জিরাফ, জেব্রা দেখলাম। জেব্রার একটি দলে বাইসনও দেখলাম। জলহস্তী দেখলাম বটে, তবে সে শুধু মাথার ওপর দিক। বাকিটা তো জলের তলায়। দুই শৃঙ্গ যুক্ত গন্ডার দম্পতি নিজেদের মধ্যে প্রেমালাপে ব্যস্ত ছিল। আমাদের বিশেষ পাত্তা দিলো না। জলাশয়ের ধারে পেলাম আমাদের সুন্দরবনের মদনটাকের বড়দাকে। চেহারায় বেশ বড়। এরা শকুনের মতোই পড়ে থাকা দেহাংশ খেয়ে পরিষ্কার করে দেয়। অনেক উটপাখি দেখেছি, তার মধ্যে এক উটপাখি গিন্নির কথা বলতেই হবে। তিনি তাঁর বাগানে বসেছিলেন। কিন্তু আমাদের জন্য ওটাই তো গাড়ির রাস্তা। তিনি উঠলেন না। কি আর করা যাবে গাড়ি পাশের রাস্তা দিয়ে ঘুরে গেলো।
সব তো হলো কিন্তু আসল যে, সেই জঙ্গলের রাজার দেখা কই! আমাদের চালক ফিরতি গাড়ির চালকদের জিজ্ঞাসা করছিলেন। একজনের কাছে জানা গেল কাছেই একজনকে দেখা গেছে। গাড়ি ঘুরিয়ে ছোট ছোট!!! অবশেষে একজনের দেখা মিলল। একাকী হেঁটে চলেছে। তার পাশ দিয়ে আমরা ছবি তুলতে তুলতে গেলাম। সে ফিরেও তাকালোনা। সার্থক হলো আমাদের জঙ্গল সফর।
ফিরে এসে এবার শুরু হলো কনফারেন্সের আনন্দ। উইকিউইমেন সামিটের দ্বিতীয়ার্ধে যোগ দিলাম। অনেক পরিচিতের সঙ্গে দেখা হলো, অনেকের সাথে নতুন করে পরিচিত হলাম, হইহই করে সময় কাটলো। বৃত্তি প্রাপক হিসেবে আমাদের বেশ কিছু দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। আমার কাজ পরের দিন থেকে শুরু হয়েছিল, দায়িত্ব ছিল বেশ কিছু সেশন চলাকালীন ইথারপ্যাডে অনলাইন নোট নিয়ে রাখা, যা পরে কাজে লাগতে পারে। প্রথমে বেশ ভয় ছিল পারব কি না। তবে ভয় কাটিয়ে পেরে গেলাম। অনেক সময় নির্ধারিত বৃত্তি প্রাপক না আসতে পারায় তার কাজও সামলেছি। বিভিন্ন সেশনে যোগ দিয়ে আলোচনা শুনে ঋদ্ধ হয়েছি। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান এবং সমাপ্তি অনুষ্ঠান সবার সঙ্গে একসাথে মজা করে উপভোগ করেছি। এই দুটি অনুষ্ঠান যেখানে হয়েছিল, সেই ট্রেডমার্ক হোটেলের অডিটোরিয়াম বেশ ছোট ছিল। ভেতরে সকলকে জায়গা দেওয়া যায়নি। তবে চারিদিকে অনেক এলইডি স্ক্রিন থাকায় খুব অসুবিধা হয়নি। কিন্তু অডিটোরিয়ামে বসে অনুষ্ঠান দেখার অনুভবই আলাদা। আমরা কয়েকজন উদ্বোধনী অনুষ্ঠান বাইরে থেকে দেখলেও সমাপ্তি অনুষ্ঠান দেখার জন্য অনেক আগে থেকেই দরজার সামনে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম এবং ভেতরে বসে সমাপ্তি অনুষ্ঠান দেখেছিলাম।
এবার আসি আমার সবচেয়ে আনন্দের কথায়। বিদেশে গিয়ে মাতৃভাষায় কথা বলেছি, এর থেকে বেশি আনন্দ আর কি হতে পারে! রকি, ইয়াহিয়া, দেলোয়ার, জিল্লুর, অনুপ, দোলন এবং আমি কাজের সময় বাদ দিলে অধিকাংশ সময় একসাথেই থাকতাম আর প্রাণ খুলে বাংলায় কথা বলেছি। মাসাই মার্কেট, মিউজিয়াম, স্নেক পার্ক, অ্যাকোয়ারিয়াম আমরা সবাই একসাথে ঘুরে দেখেছি। একসাথে কেনাকাটা করেছি। এমনকি সমাপ্তি অনুষ্ঠানের পার্টিতে দোলনের হাত ধরে নেচেও এসেছি। ওরা না থাকলে বোধহয় আমার নাইরোবি ভ্রমণ এতটা আনন্দময় হতো না।
সব ভালোরই শেষ হয়। তাই আমার নাইরোবিতে থাকার সময়ও ফুরিয়ে এলো। বিশেষ কোন কারণে আমার ফেরার ফ্লাইট ক্যান্সেল হয়ে একদিন পিছিয়ে গিয়েছিল। হাতে একদিন সময় পেয়ে অনুপকে সঙ্গী করে ঘুরে এলাম নাইরোবির বিখ্যাত পুঁতি তৈরির কারখানা কাজুরি বিড ফ্যাক্টরি থেকে। বিশেষ একটি পাহাড়ের মাটি নিয়ে আসা থেকে শুরু করে বিভিন্ন পদ্ধতির মধ্য দিয়ে কিভাবে চূড়ান্ত পণ্য বাজারে আসে সব কিছু প্রত্যক্ষ করলাম। সেখানে কেনাকাটার সুযোগও ছিল। সঙ্গে আরও যাঁরা ছিলেন তাঁরা কিনেও ছিলেন। কিন্তু দাম এত বেশি ছিল যে সামগ্রী সুন্দর হলেও আমি হাত দিতে পারিনি।
উইকিম্যানিয়ার এক অংশগ্রহণকারীর কথা মনে পড়ছে। তাঁর নামটা জানা হয়নি। দেখেছিলাম তিনি ছোট্ট একপাটি জুতো সঙ্গে নিয়ে চলেছেন। জিজ্ঞাসা করায় বলেছিলেন এটি তাঁর মৃত কন্যার জুতো, যার অন্যপাটি কবরে মেয়ের সঙ্গে শুয়ে আছে। চোখে জল এসে গিয়েছিল। কিন্তু তিনি আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে যা বলেছিলেন সংস্কৃত ভাষায় তার অর্থ চরৈবেতি অর্থাৎ জীবনে যাই ঘটুক না কেন তুমি চলতে থাকো থেমে যেও না।
