ইয়াহিয়া। ছবি: নাহিদ হোসেন / সিসি-বাই-এসএ ৪.০
মুহাম্মদ ইয়াহিয়া ২০১৭ সাল থেকে উইকিমিডিয়া আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত। বর্তমানে তিনি বাংলা উইকিপিডিয়া, উইকিউপাত্ত ও উইকিভ্রমণের প্রশাসক এবং বৈশ্বিকভাবে স্টুয়ার্ড হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া তিনি অফউইকি কার্যক্রমেও নিয়মিত অবদান রাখছেন । ইয়াহিয়া, ২০২৫ সালে গঠিত ঢাকা উইকিমিডিয়া সম্প্রদায়ের প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে উইকিমিডিয়া আন্দোলনের প্রচার এবং প্রসারে ভূমিকা রেখে চলেছেন। সাক্ষাৎকারে তিনি তার উইকিযাত্রাসহ বিভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন উইকিবার্তার কাছে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন উইকিবার্তার সহসম্পাদক আল রিয়াজ উদ্দীন।
উইকিবার্তা: উইকিবার্তায় আপনাকে স্বাগতম। উইকিপিডিয়ার সাথে কীভাবে পথচলা শুরু? শুরুটা কেমন ছিল?
ইয়াহিয়া: উইকিপিডিয়ার নামের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় হয়েছিল সম্ভবত একটি পত্রিকায় প্রকাশিত কোনো নিবন্ধ পড়ে। সেখানে জানতে পেরেছিলাম, উইকিপিডিয়ায় যে কেউই সম্পাদনা করতে পারে। তখন বিষয়টি আমার মধ্যে কৌতূহল জাগালেও, প্রথম সম্পাদনা করি ২০১৭ সালে—একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিবন্ধে ছোট একটি ভুল চোখে পড়ে, যা আমি আইপি থেকেই সংশোধন করি।
এরপর কিছুদিন টুকটাক সম্পাদনা করলেও আমার সক্রিয় সম্পাদনা শুরু হয় ২০১৮ সালের অমর একুশে নিবন্ধ প্রতিযোগিতা দিয়ে। পুরো এক মাসে আমি কেবল একটি নিবন্ধ শেষ করতে পেরেছিলাম। এটি আমার জন্য ছিল একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ, কারণ তখন আমি একটি ছোট স্ক্রিনের স্মার্টফোন ব্যবহার করতাম এবং অনুবাদ ও তথ্যসূত্র ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় অ্যাডভান্সড টুলগুলোর ব্যবহার জানতাম না। তথ্যসূত্র টেমপ্লেটের প্রতিটি প্যারামিটার তখন আমি হাতে টাইপ করতাম।
শুরুর দিনগুলোতে কমিউনিটির কিছু অভিজ্ঞ ব্যবহারকারীর আচরণ নতুনদের প্রতি আমার কাছে বেশ অনুৎসাহজনক মনে হতো। রুক্ষ ভাষা, আক্রমণাত্মক বার্তা, অথবা একেবারে ছোট ভুলেও কঠোরভাবে প্রতিক্রিয়া—এসব আমাকে প্রায়শই আতঙ্কে রাখত, আবার কখন কোন সম্পাদনার জন্য সতর্কবার্তা পেয়ে যাই!
তবে সময়ের সাথে আমি এই সংস্কৃতির বিরুদ্ধে কাজ করেছি এবং বিশ্বাস করি, আজ আমরা অনেকটাই এই সংকীর্ণতা থেকে বেরিয়ে এসেছি। এখন বাংলা উইকিপিডিয়া আরও সহানুভূতিশীল, সহযোগিতামূলক ও বন্ধু-বৎসল পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছে—যা নতুনদের জন্য অনেক বেশি ওয়েলকামিং।
উইকিবার্তা: নতুন অবস্থায় কি কি সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলেন?
ইয়াহিয়া: নতুন অবস্থায় আমার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ডিভাইসসংক্রান্ত। আমি প্রথমদিকে খুবই লো কনফিগারেশনের একটি স্মার্টফোন ব্যবহার করতাম, যার পর্যাপ্ত র্যাম না থাকায় ব্রাউজারে ট্যাব সুইচ করলেই পাতা রিলোড হয়ে যেত। আবার ফোন থেকে দৃশ্যমান সম্পাদনাও (VisualEditor) ব্যবহার করতে পারতাম না, যা অনেক ক্ষেত্রেই সম্পাদনাকে কঠিন করে তুলত।
দ্বিতীয় বড় সমস্যা ছিল পর্যাপ্ত রিসোর্স বা সহায়িকার অভাব। শুরুর দিকে আমি ভালো মানের লিখিত বা ভিডিও নির্দেশিকার খুব অভাব অনুভব করতাম, যা নতুনদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৭ বা ২০১৮ সালের দিকে গুগল ও বিং-এর অনুবাদ সরঞ্জামগুলোর বাংলা অনুবাদের মানও ছিল খুব নিম্ন। বিশেষ করে গণিত ও বিজ্ঞান সম্পর্কিত বাক্যগুলো এতটাই দুর্বোধ্যভাবে অনূদিত হতো যে, এগুলো ব্যবহার করে পরে আবার সংশোধন করার চেয়ে বরং হাতে ধরে অনুবাদ করলে সময় বাঁচতো।
আরও কিছু সমস্যার কথা আমি আগের প্রশ্নের উত্তরে উল্লেখ করেছি—যেমন কমিউনিটির কিছু অভিজ্ঞ ব্যবহারকারীর কঠোর ও নিরুৎসাহমূলক আচরণ, যা শুরুতে মানসিকভাবে চ্যালেঞ্জ তৈরি করত।
উইকিবার্তা: আপনি অফ উইকি কার্যক্রমেও বেশ সক্রিয়। উইকিমিডিয়া আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী বাড়াতে কি কি কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন?
ইয়াহিয়া: আমি সর্বশেষ অনুমোদিত আঞ্চলিক সম্প্রদায় ঢাকা উইকিমিডিয়া সম্প্রদায়কে নেতৃত্ব দিচ্ছি। ঢাকা অঞ্চলের তথ্য-উপাত্তের সমৃদ্ধি ঘটানো এবং স্বেচ্ছাসেবকদের মধ্যে সমন্বয় সাধন ও নতুন স্বেচ্ছাসেবক তৈরির লক্ষ্যে এবছরের শুরুর দিকে সম্প্রদায়টি যাত্রা শুরু করে। যাত্রা শুরুর মাত্র অল্প কয়েকমাস হলেও আমরা ইতোমধ্যে অনেক কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন করে ফেলেছি। এর মধ্যে রয়েছে নিয়মিত মাসিক উইকিমিডিয়া মিটআপ, অনলাইন কর্মশালা, ফটোওয়াক ইত্যাদি। আমরা সফলভাবে একটি দিনব্যাপী নীতিমালা অনুবাদ এডিটাথনও করেছি। ভবিষ্যতে গ্ল্যাম প্রকল্প করার ইচ্ছাও আছে।
করোনা মহামারীর পর থেকে আমি অফলাইন কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হওয়া শুরু করি। এরপর থেকে আমি অসংখ্য উইকিমিডিয়া ইভেন্টে অংশগ্রহণ করেছি, কখনও নেতৃত্বও দিয়েছি। ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত হওয়া বাংলা উইকিসম্মেলনে আমি অপারেশন্স ও কমিউনিকেশন্স দলের সদস্য হিসেবে সফলভাবে সম্মেলনটি আয়োজনে অবদান রেখেছি। আমি ২০২২ সালে অনুষ্ঠিত উইকিম্যানিয়া বাংলাদেশ সম্মেলনের মূল আয়োজক দলের সদস্য ছিলাম। এধরণের কার্যক্রম থেকে আমি সবসমই নতুন নতুন মানুষকে নিয়মিত উইকিপিডিয়ায় অবদানে উৎসাহ, পুরনোদের দীর্ঘদিন ধরে রাখার অনুপ্রেরণা দেই।
উইকিবার্তা: একজন প্রশাসক ও স্টুয়ার্ড হিসেবে কোন কাজগুলো চ্যালেঞ্জিং মনে হয়েছে?
ইয়াহিয়া: বাংলা উইকিপিডিয়ার একজন প্রশাসক হিসেবে আমার কাছে বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মনে হয় শত শত যান্ত্রিক অনুবাদে তৈরি নিম্নমানের নিবন্ধ। এগুলো উইকিপিডিয়ার গুণগত মানের জন্য হুমকিস্বরূপ। আরও দুঃখজনক হলো, অনেক ব্যবহারকারী নতুন নিবন্ধ তৈরিতে আগ্রহী হলেও পূর্বে তৈরি ত্রুটিপূর্ণ নিবন্ধগুলো সংশোধনে আগ্রহ কম দেখান, ফলে বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের নিবন্ধ মানহীনই থেকে যাচ্ছে।
সুনির্দিষ্টভাবে প্রশাসকদের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ, বিশেষ করে বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে, উইকিপিডিয়ার বিষয়বস্তুকে ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে ভুল তথ্য ছড়ানো এবং প্রশাসকদের ব্যক্তিগতভাবে দোষারোপ করা। বিগত বছরগুলোতে দেখা গেছে, কোনো একটি নিবন্ধের কিছু তথ্য নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে প্রশাসকদের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারণা চালানো হয়েছে, যা কখনো কখনো ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকেও হুমকির মুখে ফেলেছে। এই ধারা ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে।
এখানে একটি বিষয় সবার স্পষ্টভাবে জানা উচিত—উইকিপিডিয়ায় প্রকাশিত তথ্য বা কোনো নির্দিষ্ট সম্পাদনার জন্য প্রশাসকরা দায়ী নন। উইকিপিডিয়া একটি উন্মুক্ত বিশ্বকোষ, যেখানে শত-সহস্র স্বেচ্ছাসেবক প্রতিদিন নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করে অবদান রাখছেন। কখনো কখনো কেউ ব্যক্তি স্বার্থে এক-দুইটি লাইন ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেও, তা খুবই ক্ষণস্থায়ী হয়—কারণ সক্রিয় সম্প্রদায় নিয়মিতই সব সম্পাদনা পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা করে থাকেন।
স্টুয়ার্ড হিসেবে ব্যক্তিগতভাবে এমন বড় কোনো বিরূপ পরিস্থিতির সম্মুখীন হইনি। তবে এই ভূমিকার সাথে বৈশ্বিক সম্প্রদায়ের একটি বড় আস্থার সম্পর্ক জড়িত থাকায়, নিজের অ্যাকাউন্টের নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রাখতে হয়।

উইকিম্যানিয়া ২০২৫ এ উইকিপিডিয়ার সহপ্রতিষ্টাতা জিমি ওয়েলস এর সাথে ইয়াহিয়া। ছবি: রকি মাসুম/ সিসি-বাই-এসএ ৪.০
উইকিবার্তা: উইকিমিডিয়া আন্দোলন নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
ইয়াহিয়া: আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে বাংলা ভাষার উইকিমিডিয়া প্রকল্পগুলোতে অবদানকারীদের দক্ষতা উন্নয়ন, স্থানীয় সম্প্রদায়ের ক্ষমতায়ন, এবং নতুন অবদানকারীদের যুক্ত করে একটি টেকসই ও সক্রিয় সম্প্রদায় গড়ে তোলা। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে এ বছরের শুরুতে আমরা গঠন করেছি ‘বাংলা উইকিসংযোগ’। এই প্রকল্পের মাধ্যমে স্বেচ্ছাসেবীরা নেতৃত্বদানের দক্ষতা অর্জন করছেন এবং ধাপে ধাপে একটি টেকসই সম্প্রদায়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন।
আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হলো এই উদ্যোগকে আরও বিস্তৃত করা এবং বাংলা উইকিমিডিয়া সম্প্রদায়ের সামগ্রিক সক্ষমতা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। পাশাপাশি, বাংলা ভাষার বিষয়বস্তু আরও সমৃদ্ধ করা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলা সম্প্রদায়ের দৃশ্যমানতা বাড়ানোও আমার অন্যতম লক্ষ্য।
উইকিবার্তা: বাংলা উইকিপিডিয়া ও এর সহপ্রকল্পগুলোতে নতুনদের কীভাবে আকৃষ্ট করা যায় বলে আপনি মনে করেন?
ইয়াহিয়া: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও শর্ট ভিডিওর এই যুগে তরুণ প্রজন্মকে উইকিপিডিয়ার মতো ধৈর্য ও মনোযোগ দাবি করে—এমন কাজে আগ্রহী করে তোলা নিঃসন্দেহে একটি চ্যালেঞ্জিং কাজ। বাংলা উইকিপিডিয়া ও এর সহপ্রকল্পগুলোতে নতুনদের আকৃষ্ট করতে হলে মুক্ত জ্ঞানের গুরুত্ব সম্পর্কে গণসচেতনতা তৈরি করতে হবে এবং ‘ওপেন নলেজ’-এর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরতে হবে। বোঝাতে হবে, মুক্ত জ্ঞানই ভবিষ্যতের ভিত্তি।
এ লক্ষ্যে বিষয়ভিত্তিক কর্মশালা, স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক আউটরিচ প্রোগ্রাম, অনলাইন প্রতিযোগিতা ইত্যাদি আয়োজন করা যেতে পারে। আমরা ইতোমধ্যে দেখেছি, অনলাইন প্রতিযোগিতা থেকে অনেক নতুন উইকিমিডিয়ান তৈরি হয়েছেন। পাশাপাশি, ব্যবহারবান্ধব লিখিত ও ভিডিও নির্দেশিকা তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান সময়ে শর্ট ভিডিও খুবই জনপ্রিয়—এজন্য উইকিমিডিয়া সম্পাদনা বিষয়ক ছোট ছোট শিক্ষামূলক ভিডিও তৈরি করে তরুণদের সহজভাবে সম্পাদনায় উৎসাহিত করা যেতে পারে।
উইকিবার্তা: বাংলা উইকিপিডিয়ার বর্তমান অবস্থান নিয়ে আপনার মতামত কি?
ইয়াহিয়া: বাংলা ভাষা বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম মাতৃভাষা এবং ভাষাভাষির সংখ্যার দিক থেকে সপ্তম বৃহত্তম ভাষা। প্রায় ২৮৪ মিলিয়ন মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলেন। এত বড় ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর তুলনায় বাংলা উইকিপিডিয়া এখনও প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায়নি বলে মনে করা যায়। তবে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য ভাষার উইকিপিডিয়ার তুলনায় বাংলা উইকিপিডিয়ার অবস্থান তুলনামূলকভাবে ভালো।
বর্তমানে বাংলা উইকিপিডিয়ায় ১ লক্ষ ৭৫ হাজারের বেশি নিবন্ধ রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলা উইকিপিডিয়া কিছু উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে—নিবন্ধ সংখ্যা বেড়েছে, সম্প্রদায় আরও সচেতন ও সংগঠিত হয়েছে। তবে এখনও গুণগত মান বজায় রাখা, নির্ভরযোগ্য উৎসে তথ্য নিশ্চিত করা এবং নতুন ও সক্রিয় অবদানকারীর সংখ্যা বাড়ানো—এই দিকগুলোতে উন্নয়নের সুযোগ রয়েছে। উইকিপিডিয়ার টেকসই উন্নয়নের জন্য নিয়মিত পৃষ্ঠপোষকতা, দক্ষতা বৃদ্ধি ও সক্রিয় সম্প্রদায় গঠন এখন সময়ের দাবি।
উইকিবার্তা: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে উইকিপিডিয়া নিয়ে আপনার মতামত কি?
ইয়াহিয়া: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রগতির ফলে উইকিপিডিয়ার পাঠকসংখ্যা কিছুটা কমেছে, ভবিষ্যতে আরও কমতে পারে—এই বাস্তবতাকে আমাদের মেনে নিতে হবে। তবে আমি মনে করি না উইকিপিডিয়া কখনোই সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাবে। বরং বলা যায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জ্ঞানের অন্যতম প্রধান উৎসই হচ্ছে উইকিপিডিয়া ও অন্যান্য উইকিমিডিয়া প্রকল্প। লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলগুলোর সুপারভাইজড লার্নিংয়ের জন্য উইকিমিডিয়ার মুক্ত জ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
এআই মানব জ্ঞানের বিকল্প নয়—মানুষ জ্ঞান তৈরি করে, আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেই জ্ঞান থেকে শেখে ও সিদ্ধান্ত নেয়। তাই আমাদের উচিত, যুগের সাথে তাল মিলিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে সহায়ক হিসেবে গ্রহণ করা। AI-ভিত্তিক উদ্ভাবনী টুল ব্যবহার করে উইকিপিডিয়ায় অবদান রাখার কাজ আরও সহজ, কার্যকর ও গতিময় করা সম্ভব। বিশেষ করে রিপিটেটিভ ও সময়সাপেক্ষ কাজগুলোতে এআই টুলের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে।
সম্প্রতি উইকিমিডিয়া ফাউন্ডেশন এআই ব্যবহারে একটি নীতি প্রকাশ করেছে, যেখানে একই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা হয়েছে। বর্তমান সময়ের AI মডেলগুলো প্রাঞ্জল বাংলা ভাষা বলতে ও লিখতে পারছে, ফলে ভবিষ্যতে অনুবাদনির্ভর নিবন্ধ তৈরির প্রয়োজন হয়তো অনেকটাই কমে যাবে। ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা দ্রুত কমে আসবে বলেও আশা করা যায়।
এই প্রেক্ষাপটে আমাদের মনোযোগ দেওয়া উচিত মৌলিক ও উচ্চমানের বাংলা নিবন্ধ তৈরির দিকে। কারণ মৌলিক জ্ঞানের জায়গা কখনোই AI দখল করতে পারবে না। যেমনটি আগে বলেছি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানবিক চিন্তা ও সৃজনশীলতার বিকল্প হতে পারে না।
উইকিবার্তা: বৈশ্বিক উইকিমিডিয়া সম্প্রদায়ের সাথে কাজ করার অভিজ্ঞতা কেমন? বৈশ্বিকভাবে বাংলাভাষীদের বর্তমান অবস্থান নিয়ে কতটুকু সন্তুষ্ট?
ইয়াহিয়া: একজন স্টুয়ার্ড এবং বাংলা উইকিপিডিয়ার প্রতিনিধি হিসেবে আমি প্রায়ই বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির উইকিমিডিয়ানদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পাই। এই অভিজ্ঞতা আমার দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রসারিত করেছে এবং আমাকে উইকিমিডিয়ার বৈশ্বিক কাঠামো ও ওপেন নলেজ ইকোসিস্টেম সম্পর্কে গভীরভাবে জানতে সাহায্য করেছে। বিভিন্ন পটভূমির মানুষের সঙ্গে কাজ করা শিখিয়েছে অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার গুরুত্ব।
তবে, বাংলাভাষার আকার ও সম্ভাবনার তুলনায় বৈশ্বিক পরিসরে আমাদের প্রতিনিধিত্ব এখনো তুলনামূলকভাবে সীমিত। আন্তর্জাতিক আলোচনায়, কমিটি বা বোর্ডে নেতৃত্বে, নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় বা বিভিন্ন সিদ্ধান্তগ্রহণে বাঙালির আরও বেশি সম্পৃক্ততা দেখা আমার প্রত্যাশা। আমি বিশ্বাস করি, বৈশ্বিক পর্যায়ে বাংলা সম্প্রদায়ের অবস্থানকে দৃঢ় ও মর্যাদাপূর্ণ করার জন্য আমাদের আরও সাহস হয়ে এগিয়ে আসা উচিত।
বাংলা উইকিসম্মেলন ২০২৪ এ ইয়াহিয়া। ছবি: নাহিদ হোসেন / সিসি-বাই-এসএ ৪.০
উইকিবার্তা: আপনি ব্যক্তিগতভাবে উইকিপিডিয়ায় অবদান রাখার মাধ্যমে কী কী শিখেছেন?
ইয়াহিয়া: উইকিপিডিয়ায় অবদান রাখার মাধ্যমে আমি গবেষণার মনোভাব, তথ্য যাচাইয়ের দক্ষতা, দলগতভাবে কাজ করার অভ্যাস এবং নেতৃত্বদানের ক্ষমতা অর্জন করেছি। পাশাপাশি, বিভিন্ন ভাষা, দেশ ও সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে সহনশীলতা ও আন্তঃসাংস্কৃতিক যোগাযোগ দক্ষতা তৈরি হয়েছে, যা আমার দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও প্রসারিত করেছে।
প্রযুক্তিগত দিক থেকেও উইকিপিডিয়া আমাকে সমৃদ্ধ করেছে। জাভাস্ক্রিপ্ট, সিএসএস, মিডিয়াউইকি কাঠামো, টেমপ্লেট ইঞ্জিন ইত্যাদি বিষয়ে হাতে-কলমে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। একইসঙ্গে, দায়িত্বশীলতা, সময় ব্যবস্থাপনা এবং স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজের গুরুত্ব সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি, যা আমার ব্যক্তিজীবনেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
উইকিবার্তা: ভবিষ্যতে উইকিপিডিয়ায় অবদান রাখতে আগ্রহীদের জন্য আপনার কী পরামর্শ থাকবে?
ইয়াহিয়া: আমি বলব, শুরুটা হোক কৌতূহল দিয়ে। উইকিপিডিয়া শেখার জায়গা এবং এটি এমন এক জায়গা যেখানে ভুল করেও শেখা যায়। তবে নীতিমালা ও নির্দেশিকা বুঝে, অন্যদের কাজ দেখে শেখাটা জরুরি। ধৈর্য, সহানুভূতি ও দলগত মানসিকতা থাকলে যেকোনো নতুন ব্যবহারকারী নিজেকে দ্রুত দক্ষ অবদানকারীতে পরিণত করতে পারবে। এই দক্ষতা আপনার বাস্তব জীবন ও ক্যারিয়ার গঠনেও কাজে লাগবে।
উইকিবার্তা: উইকিবার্তায় সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ। আপনার উইকিপথচলা অব্যাহত থাকুক।
ইয়াহিয়া: আপনাকেও অসংখ্য ধন্যবাদ। উইকিবার্তার উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করছি।
