
বাংলা উইকিসম্মেলন ২০২৪। ছবি: অনুপ সাদি। উইকিমিডিয়া কমন্স
আমি ৮ বছর ধরে উইকিপিডিয়া ও উইকিমিডিয়ার অন্যান্য প্রকল্পে অবদান রাখছি। উইকির সাথে এই পথ চলাতে একটি বিষয় খেয়াল করেছি নারী অবদানকারীরা দীর্ঘ সময় সক্রিয় থাকেন না। তবে নারীরা যে উইকিমিডিয়ার প্রকল্পগুলোতে অবদান রাখেন না বিষয়টি তেমন না। তাঁরা কাজের ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং দীর্ঘদিন যুক্ত থাকেন না। এটা নিয়ে নানা প্রশ্ন ও কারন উঠে এসেছে অতীতের নানা আলোচনা, মিটিং, জরিপ থেকে। বাংলা উইকিসম্মেলন ২০২৪-এ আমার উপস্থাপনায় ৩টি বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছি। তারমধ্যে একটি হল- উইকিমিডিয়ায় নারী অবদানকারীদের সক্রিয়তা বাড়াতে করনীয়। এই বিষয়টি বুঝতে হলে আমাদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা উচিত। উইকিতে আমার কাজের অভিজ্ঞতা ও ময়মনসিংহ উইকিমিডিয়া সম্প্রদায়ের নানা কার্যক্রম পরিচালনার ফলে মেয়েদের সাথে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। সেই প্রেক্ষিতে কিছু বিষয় তুলে ধরছি।
১. অনুরোধ বা অনিচ্ছায় যুক্ত হওয়া
২. আনন্দ না পাওয়া
৩. কাজের ধারাবাহিকতা না বুঝা
৪. মানসিক অস্থিরতা বা সিদ্ধান্তহীনতা
৫. বৈশ্বিক বিষয়ে আগ্রহ কম থাকা
৬. পরিবার কেন্দ্রিক মানসিকতা
৭. অন্যান্য
স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে দেখা যায় আমরা সাধারণত অন্যের দ্বারা অনুপ্রেরণা পেয়ে যুক্ত হয়ে থাকি। যদি কোন ক্ষেত্রে বন্ধু, আত্মীয় দ্বারা কেউ যুক্ত হয়ে যায়। কিছুদিন পরে যখন বুঝতে পারে তার আগ্রহের জায়গা আসলে অন্য কিছু তখন অল্পদিনেই কাজ থেকে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়।
কিছু কিছু ব্যক্তি অনলাইনের কাজ আনন্দ পাওয়ার জন্য করে। উইকিতেও তেমনই মনোভাব নিয়ে অনেকে আসে। বাংলা উইকিপিডিয়া প্রথম দর্শনে দেখতে সাধারণ ফন্টের মতো মনে হতে পারে কিন্তু সম্পাদনার করার সময় যে রূপ দেখা যায় তাতে প্রথম প্রথম সমস্যা হবেই, এটাই স্বাভাবিক। সেটা যেমন আনন্দের না বা চোখ স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেন না। এছাড়া কেউ যদি মনে করে এখানে এসেও পড়াশুনা করতে হচ্ছে তাহলে আগ্রহ কমতে থাকে। তাছাড়া ফেসবুক, ইউটিউব যত সহজে বিনোদন দিতে পাচ্ছে উইকি সেটা পারে না।
উইকির বিভিন্ন প্রোগ্রামে ছেলে অবদানকারীর উইকিতে নিজের যুক্ততা বিষয়ে কথা বলেছেন। সেখান থেকে বুঝা যায়, পড়ার বিষয় খুঁজতে বা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ থেকে তারা উইকিপিডিয়ায় সম্পাদনা শুরু করেন। তখন যে কেউ ছোট ছোট সম্পাদনা করে কাজের ধারাবাহিকতা রেখেই যায়। মেয়েদের ক্ষেত্রে এমনটা খুব কম হয়েছে। এরপরে এমন লেখালেখি বা ডকুমেন্টেশনের ক্ষেত্রে নিজের পছন্দ বা আগ্রহের বিষয়ে খুব কম থাকে। তাই ধারাবাহিকতাও ঠিকঠাক রাখতে পারেনা।
মেয়েদের কাজের আরেকটি প্রতিবন্ধকতা আছে। ছাত্রজীবনে সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক কারণে নানা বাঁধার মুখোমুখি হতে হয়। “নানা জনের মন রক্ষা করে চলা” এমন পরিস্থিতিতে মেয়েদের একধরনের মানসিক অস্থিরতায় থাকতে হয়। অনেক মেয়ের বৈশ্বিক বিষয়ের চেয়ে পারিবারিক দিকে আগ্রহী বেশি থাকে। এটা অবশ্য ছোটবেলা থেকেই তৈরি হয়। বৈশ্বিক ব্যাপারগুলো এতো জটিল থাকে যে সেটাতে যাওয়ার আগ্রহ অনেকেরই থাকে না। পরিবারের চেয়ে আরো নির্দিষ্ট করে বলতে বুঝায় ‘সংসার’। সংসারের নানা দায়িত্ব যেমন একায় নেওয়ার ইচ্ছা থাকে তেমনি চাপিয়েও দেওয়া হয়। সংসারের সকাল থেকে শুরু করে রাত পর্যন্ত অনেক খুঁটিনাটি বিষয় খেয়াল রাখতে হয়। তাঁদের সৃজনশীল কাজে যুক্ত করতে চাইলেই নানা অজুহাত দেখাবে না-হয় কাজটা পছন্দ নয় এমনটাই বলবে।
এছাড়াও অনেক কারন তো আছেই। ইউটিউব দেখা, বন্ধুর সাথে চ্যাটিং, রিল দেখা ইত্যাদি থেকে সহজেই আনন্দ খুঁজে নেয়। আমাদের অনেক উইকিপিডিয়ান আছেন যারা বন্ধু-বান্ধবীদের উইকিতে যুক্ত করতে গিয়ে এইধরনের সমস্যায় পরতে হয়।
সমস্যার সমাধান:
এই সমস্যার সমাধান আমরা উইকিপিডিয়ানরা তেমন কিছুই করতে পারি না। তবে যারা উইকিতে যুক্ত আছে তাঁদের সক্রিয় রাখার জন্য নানা পরিকল্পনা নিতে পারি। আবার নতুনদের যুক্ত করতে কিছু পদক্ষেপ নিতে পারি। জেন্ডার গ্যাপ বিষয়টি বর্তমান সময়ে সমাধানের জন্য নয়। এটার একটা সামাজিক চাহিদা আছে। মানুষ শুনতে চায়, আলোচনা করতে চায়, প্রচারণা বাড়াতে চায়। এমন না যে সামাজিকভাবে নারীদের সমস্যা ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে কেউ জানে না। মূলত আমাদের মধ্যে অনেকেই আছে সমস্যা বা সীমাবদ্ধতাগুলোকে মানতে চায় না। সহযোগিতামূলক মনোভাব নিয়ে সমাধান করার পক্ষের লোক অনেক কম। মেয়েরাও যেমন সমস্যাটি বলে দুঃখ লাঘব করে ছেলেরাও তেমনি শুনে। আবার একটা সময় স্বাভাবিক হয়ে যায়। উইকিমিডিয়া বাংলাদেশ থেকে একটি জরিপ করা হয়েছিলো। সেখানে নারী অবদানকারীদের সক্রিয়তা বাড়াতে কিছু পরিকল্পনা উঠে এসেছে। এছাড়া এইবছর উইকিনন্দিনী নামে একটি নতুন প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয়েছে। এই বছর থেকে কিছু কার্যক্রমের আয়জন করা হয়েছে। আমরা আশাবাদী এর ফলে নারীদের সক্রিয়তা বাড়বে।
