লেখক: ইশতিয়াক আব্দুল্লাহ। ছবি: নাহিদ হোসেন / সিসি-বাই-এসএ ৪.০
বাংলা উইকিসম্মেলন সম্পর্কে আমি প্রথম জানতে পারি ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারির দিকে। সকল উইকিমিডিয়া সহ-প্রকল্পের অবদানকারীদের নিয়ে একটি সম্মেলন আয়োজন করা হবে- এমনটিই জানতে পেরেছিলাম। ভেবেছিলাম, এ আর এমন কী! প্রতিবছরই কত কত অফলাইন কার্যক্রমে অংশ নিই, এরকম কিছু একটাই হয়তো হবে, হয়তো দিনব্যাপী কার্যক্রম আর কয়েকটা বিশেষ সেশন হবে, এই! আর কিছুই না। আমার ধারনা ভুল প্রমাণ হতে সময় লেগেছিল জুলাই মাস পর্যন্ত। জুলাই মাসের এক তারিখ বাংলা উইকিসম্মেলনের জন্য বৃত্তির ফর্ম আহ্বান করা হয়। সে দিনই প্রথম বাংলা উইকিসম্মেলন সম্পর্কে জানতে পারি। বুঝলাম, এটা আর দশটা অফ-উইকি কার্যক্রমের ন্যায় নয়। প্রথম দিনই আবেদন করে ফেললাম। তারপর থেকে নিয়মিত বিরতিতে উইকিসম্মেলন সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানতে পারলাম।
০২ আগস্ট অনুষ্ঠিত মিটআপে এ সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানলাম। সে সময়ে চলছিল কোটা-সংস্কার আন্দোলন ও পরবর্তীতে গণ-অভ্যুত্থান। চারদিকে অস্থিতিশীল পরিবেশ। আমি চিন্তা করছিলাম, আমরা কী সম্মেলনটা আদৌ করতে পারবো? চারদিকে যেমন অস্থিতিশীল পরিবেশ, সম্মেলন আয়োজন করা সম্ভব হল না সেই সময়ে। মনে হচ্ছিল, আমাদের সম্মেলন বুঝি অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য পিছিয়ে যাবে।
পিছালো, তবে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য না। আগে তারিখ ছিল ১৮-১৯ অক্টোবর, পরবর্তীতে তারিখ নির্ধারিত হল ১৫-১৬ নভেম্বর। ততদিনে দেশে গণ-অভ্যুত্থান ঘটার মধ্য দিয়ে ক্ষমতা কাঠামোর পরিবর্তন ঘটলো। ফলে নিশ্চিন্ত থাকলাম, যেই তারিখ নিশ্চিত করা হয়েছে তার পরিবর্তন হবে না।
কিছুদিন পর জানতে পারলাম, আমার আবেদন গৃহীত হয়েছে। উইকিসম্মেলনের ওয়েবসাইট থেকে জানতে পারছি, তারিখটা ছিল ০২ সেপ্টেম্বর। আমি প্রথম ধাপেই বৃত্তির জন্য নির্বাচিত হয়েছিলাম। ইমেইলে বৃত্তি প্রাপ্তির ব্যাপারটি জানানো হলো এবং অনুরোধ করা হল বৃত্তি প্রাপ্তি কনফার্ম করার জন্য। আমি সাথে সাথে কনফার্ম করে দিলাম। এর পর চলতে থাকলো অপেক্ষা। এর মধ্যে নিয়মিতই উইকিসম্মেলন সাইটে আপডেটের জন্য চোখ রাখতে লাগলাম। এর মধ্যেই সম্মেলনের অংশগ্রহণকারীদের জন্য খুলে ফেলা হলো টেলিগ্রাম গ্রুপ। সেখানেও যুক্ত হলাম। নিয়মিত সম্মেলনের প্রস্তুতি নিয়ে কথা হত অন্যান্য অংশগ্রহণকারীদের সাথে।
০২ নভেম্বর আয়োজন করা হয় সম্মেলন-পূর্ব মিটিং, যা শুধু সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীদের জন্য উন্মুক্ত ছিল। সেখানে আমরা সম্মেলন নিয়ে সকল বিস্তারিত তথ্য পেয়ে যাই (শুধু অনুষ্ঠানসূচি বাদে)। এর মধ্যে রেজিস্ট্রেশন করে ফেলি হ্যাকাথনের জন্য। ১১ তারিখ সেটার অনলাইন মিটিং-ও অনুষ্ঠিত হয়। ১৪ তারিখ ঢাকা থেকে সম্মেলনস্থলে যাওয়ার জন্য একটি মিনিবাসের ব্যবস্থা করা হয়। আমি নিজেও মিনিবাসে করে সম্মেলনে যাবার জন্য আগেই ফর্ম পূরণ করে রেখেছিলাম।
১৩ তারিখ সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করে উইকিপিডিয়ান মো. জনি হোসেন ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ করি। পরিকল্পনা করি, আমরা দুজনে একত্রে মহাখালী থেকে মিরপুর যাবো। মিরপুর থেকে আমরা মিনিবাসে উঠবো। দেখতে দেখতে এলো ১৪ তারিখ। সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করে বাসা থেকে বের হলাম। পরিকল্পনা মতো মহাখালী পৌঁছে জনি ভাইয়ের সাথে মিলিত হলাম। তারপর একত্রে মিরপুর গেলাম আমরা দুজন।
বাসের দায়িত্বে ছিলেন দেলোয়ার ভাই। তার সাথে যোগাযোগ করে আমরা মিনিবাসে উঠলাম। দেড়টার কিছু পর আমাদের যাত্রা শুরু হলো। পুরোটা সময় জুড়ে আমরা গল্প, হাসি-ঠাট্টা, উইকি-পরিকল্পনা ইত্যাদি নিয়ে মেতে ছিলাম। অনেক উইকিমিডিয়ানের সঙ্গে প্রথম পরিচয় ঘটলো, যেমন খাত্তাব ভাই, সাজিদ রেজা করিম ভাই প্রমুখ। বিকেলে আমরা সম্মেলনস্থলে পৌঁছালাম।
ড্রিম স্কোয়ার রিসোর্টে আমাদের এ সম্মেলন আয়োজিত হয়। রিসোর্টে আগে থেকেই কার্যপরিচালন দলের একাধিক সদস্য উপস্থিত ছিলেন। রিসোর্টে চেক-ইন করে নিই আমরা। আমার রুমমেট ছিলেন হাসনাত আব্দুল্লাহ ভাই। আমাদের রুম নম্বর ছিল ২০২। প্রাক-সম্মেলন দিনে আমরা রিসোর্ট ঘুরে দেখলাম। আরো কিছু উইকিমিডিয়ানদের সাথে পরিচিত হলাম। উইকি ও অন্যান্য বিষয়ে বেশ জম্পেশ একটা আড্ডা হলো। তবে একটা সময় অসুস্থ অনুভব করায় রুমে ফিরে যাই।
ডিনার করার সময় আমরা সকলে রেস্টুরেন্টে সমবেত হই। প্রথম দিন বেশ ভালোই ডিনার করেছিলাম। ডিনার শেষে আমরা আবার ঘুরতে বের হই। তারপর রুমে চলে আসি, এবং ঘুমিয়ে পড়ি।
পরের দিনটি ছিল সম্মেলনের প্রথম দিন। এ দিন সকালে নাহিদ সুলতান ভাইয়ের উদ্বোধনী বক্তব্যের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়। এর পর বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের সাবেক মহাপরিচালক জনাব ফয়জুল লতিফ চৌধুরীর অসাধারণ একটি সেশন অনুষ্ঠিত হয়। এর পর হয় পরিচিতি পর্ব। যথারীতি আবারও কিছু নতুন উইকিমিডিয়ানকে চিনলাম। তারপর প্রশাসকদের প্যানেল আলোচনা শেষে চা-বিরতি হয়।
এদিকে আমি অসুস্থ থাকায় চা-বিরতির পর রুমে চলে যাই। ফিরে আসি লাঞ্চের আগে। লাঞ্চের পর চলে যাই হ্যাকাথন রুমে। সেখানে আমি, খাত্তাব ভাই, মেহেদী আবেদীন ভাই প্রমুখ কাজ করছিলাম। সম্মেলন শেষ হবার ঠিক আগে আমাদের ডেকে নেয়া হয়। আমরা প্রথম দিনের ফটোসেশনে অংশ নিই। তারপর আবার চা-বিরতি। চা-বিরতি শেষে আমি নিজ রুমে চলে যাই। সে দিন অসুস্থতার মাত্রা বেশি থাকায় অংশ নিতে পারিনি ডিনারেও।
পরবর্তী দিন সম্মেলনে যেতে একটু দেরি হয়ে যায় আমার অসুস্থতার জন্য। খেয়াল না থাকায় দেলোয়ার আকরাম ভাইয়ের সেশন মিস হয়ে যায়, যা ছিল উইকিসম্মেলনে আমার প্রধান আকর্ষণ। সম্মেলনে যাবার পর কিছু সেশনে অংশ নিই। তারপর খাবার বিরতিতে যাই। এই বিরতির সময় আমরা আমাদের সম্মেলনের গ্রুপ ফটো তুলি। এ দিকে অসুস্থ থাকায় কিছু খেতে পারছিলাম না। ফলে বুফে খেতে গিয়েও আমি শাক-ভাত খেয়েছি আক্ষরিক অর্থেই। শাক-ভাত ব্যতীত আর কিছুই খেতে পারিনি। সেটুকু খেয়ে আবার ফিরে আসি সম্মেলনে।
সম্মেলনে তখন হ্যাকাথন শো-কেস শুরু হবার কথা। আমি সম্মেলনে কোন সেশন পরিচালনা না করলেও যে সেশন দুটোর সাথে আমি সবচেয়ে বেশি জড়িত, সেটার একটি হল এই সেশন। তাই একটু উত্তেজিত ছিলাম। ইয়াহিয়া ভাই ও শাকিল ভাই আগে তাদের কাজের প্রদর্শনী করেন। তারপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সংক্রান্ত আমাদের কাজের প্রদর্শনী হয়। তারপর ভাষা-প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ জনাব মামুন অর রশীদ ও উইকিমিডিয়া বাংলাদেশের সভাপতি জনাব শাবাব মুস্তাফা দুটি সেশন নেন। তারপর বাংলা উইকিপিডিয়ার ২০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কেক কেটে সম্মেলনের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।
সম্মেলন সমাপ্তির পর আমরা চা-বিরতিতে যাই। তারপর রুমে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিই। তারপর ফুটবল খেলতে চলে যাই। কিন্তু ফুটবল খেলতে আগ্রহী লোকের সংখ্যা কম থাকায় ব্যাডমিন্টন শুরু হয়। এ সময় আমি রেফারির দায়িত্ব পালন করি। ফাইনালে সুব্রতদা ও মঈনুল ভাইয়ের টিম চ্যাম্পিয়ন হয়।
তারপর শেষবারের মতো ডিনারে যাই। কিন্তু যেমনটি সম্মেলনে আসার আগে আশা করেছিলাম, তেমনটি হয়নি। কথা ছিল শেষ ডিনারটি হবে গালা ডিনার, লাইভ বার-বি-কিউ করা হবে। অথচ শেষ ডিনারের সময় গালা ডিনার আয়োজন না করে সাধারণ বুফে ডিনার আয়োজন করা হয়। আর শেষ ডিনারে খাবারের মান ছিল সবচেয়ে খারাপ, পুরো আশাহত হয়েছিলাম। প্রায় সকল উইকিপিডিয়ান এই ব্যাপারে একমত। পরবর্তী দিন আমরা সম্মেলনস্থল হতে ফিরে যাওয়ার কথা। আমি একটু লেট করে ঘুম থেকে উঠে খাবার খেতে গেলে আরটিভির সাংবাদিক দেলোয়ার হোসেন ভাইয়ের
মুখোমুখি হই। তিনি এই সম্মেলন আরটিভিতে কাভার করছিলেন। তিনি আমাকে জানান, এই বয়সে উইকিপিডিয়ায় এরকম অবদান রাখার প্রেক্ষিতে তিনি আমার সাক্ষাৎকার নিতে চান। তখন আমি আরটিভিতে সাক্ষাৎকার প্রদান করি, যা পরে ইউটিউব ও ফেসবুকে প্রকাশ করা হয়। শুধু ফেসবুকেই আমার সাক্ষাৎকার ১৫ লাখের বেশি দেখা হয়েছে। এ দিকে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে খাবার খেতে লেট হয়ে যায়। ফলে খাবার খেতে সময় বাকি ছিল মাত্র পাঁচ মিনিট। কোনোমতে ব্রেকফাস্ট শেষ করে রিসিপশনে যাই এবং চেক-আউট করে গাড়িতে উঠি। প্রায় সাড়ে এগারোটার দিকে গাড়িটি রিসোর্ট ছেড়ে যায়।
যাবার সময়ের মতো মজা করতে করতে যাত্রা করা আর হয়ে উঠেনি আসার সময়। তবে তাও গল্প-গান-পরিকল্পনায় ভালোই সময় কেটেছে। আমি কারওয়ান বাজারের দিকে গাড়ি থেকে নেমে যাই। পরবর্তীতে বাসায় ফিরে আসি। এভাবে আমার উইকিসম্মেলন ২০২৪ শেষ হয়। সম্মেলনের সময় হয়ত শেষ, কিন্তু স্মৃতি নয়। আমি অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছি বাংলা উইকিসম্মেলন ২০২৫-এর জন্য!
