হ্যাকাথন বাংলা উইকিসম্মেলন-২০২৪। ছবি: খাত্তাব হাসান / সিসি-বাই-এসএ ৪.০

প্রথম যখন হ্যাকাথনের কথা শুনেছিলাম মিডিয়াউইকির মারফত, তখন মনে করেছিলাম এখানে হ্যাকার সংস্কৃতির কিছু করা হবে। তখন আবার মিডিয়াউইকিতে বলা থাকতো যে, মিডিয়াউইকি হ্যাক করুন। আমার আবার অপরাধবোধ একটু কম, সেজন্য হ্যাকিং করতে চাইতাম ছোটকাল থেকেই। এই কারণে ২০১৬ সাল থেকেই আমি মিডিয়াউইকি হ্যাক (!) করতে সচেষ্ট ছিলাম। কিন্তু তখন এক্সেস ইত্যাদি একটু কম ছিল, তাই তখন তেমন সফলতা লাভ করতে পারিনি। পরবর্তীতে উইকিপিডিয়ায় সম্পাদনা করতে করতে আর অনলাইন বিভিন্ন কোর্স থেকে অল্প কিছু ডেভেলপমেন্টের জ্ঞান হাসিল হয়, সেই প্রেক্ষিতে আমি বিভিন্ন স্ক্রিপ্ট ইত্যাদির কাজ করেছিলাম। হতাশ তখন হই, যখন জানতে পারি, শুধু অনেক লোক মিলে ডেভেলপমেন্টের কাজ করাকেই নাকি হ্যাকাথন বলে। শেষপর্যন্ত হ্যাকাথন পাতাটাও বাংলায় অনুবাদ করে ফেলি।

বাংলাদেশে ডেভেলপমেন্ট ম্যারাথন ধরনের কোনো কাজের চিত্র দেখা যায়না। দুয়েকটা উদ্যোগ যে নেই, তা নয়। কিন্তু সেগুলির নামকরণ ও প্রসারে বেশ সমস্যা থাকে। হ্যাকাথনের সংস্কৃতি বোধহয় আমাদের সংস্কৃতির সাথে যায়না। সবাই বেশ ভদ্র, তাই আমরা হ্যাক শব্দের ধারে কাছেও হয়ত যেতে চাইনা। এছাড়া উন্মুক্ত উৎসের জন্য কাজ করা যেন এখানে মহাপাপ। দেখা যায়, আমাদের দেশে অনেক বড় ডেভেলপার বা গুণী প্রোগ্রামার থাকার পরও এই ধরনের উদ্যোগ নেই।

২০২৪ সালের বাংলা উইকিসম্মেলনের অনুষ্ঠান ও বিন্যাস উপদলে থাকার কারণে হ্যাকাথন নিয়ে একটু চেষ্টা করার চিন্তা করেছিলাম। কিন্তু নকীব ভাই আর মাহির ভাই উভয়েই ব্যস্ততার কারণে সম্মেলনে আসছেন না জেনে আমরা সবাই এই চিন্তা থেকে ক্ষান্ত দিয়েছিলাম যে, নেতৃত্ব দেয়ার মতো কেউই থাকছেন না। যদিও ইতোমধ্যে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আর হ্যাকাথন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু মূলত আমাদের সিদ্ধান্ত হ্যাকাথন না করারই ছিল।

তবে অক্টোবরে এসে কয়েকজন আগ্রহ দেয়ায় আমি আমাদের উপদলের সভায় হ্যাকাথন নিয়ে সচেষ্ট হলাম যে, বাংলায় হ্যাকাথন অন্তত শুধু হোক। আমাদের এই অঞ্চলে তো কম্পিউটার প্রকৌশল নিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের সংখ্যা নিরেট কম না। কিন্তু উপদলের প্রায় সবাই বললেন যে, হ্যাকাথন আসলে তেমনটা যৌক্তিক কাজ হবেনা। কারণ, কোর ডেভেলপার কেউই নেই। একই কথা অনুষ্ঠানের এক সপ্তাহ আগে শাকিল ভাইও বলেছিলেন। আমার হয়ত এতে হতাশ হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু আমি হতাশ হতে পারিনি। কারণ, হ্যাকাথনে আগ্রহীদের সংখ্যা দেখে ইতোমধ্যেই হ্যাকাথনের জন্য নির্ধারিত কক্ষ দেয়া হয়ে গিয়েছিল। আমাদের শেষ সভায় জিল্লুর রহমান ভাই আমাকে বললেন, পরবর্তী অনুসন্ধানের স্বার্থে সবকিছু ফ্যাব্রিকেটরে রেকর্ড রাখতে। সেই ধারায় আমি মাত্র দুইদিন আগে ফ্যাব্রিকেটরে টাস্ক ও ট্যাগের জন্য আবেদন করি, যা ১৬ তারিখে অনুমোদিত হয়।

অভিজ্ঞ বা কমপক্ষে স্ক্রিপ্ট ইত্যাদি নিয়ে কাজ করেন, এমন কয়েকজনের সাথে কথা বললাম। তারা প্রায় কেউই তেমন আগ্রহ দেখাতে পারলেন না। বেশিরভাগের উত্তর ছিল, উইকিসম্মেলনে আসতে পারছেন না। তাই আগ্রহ দেখানো হয়ত নিরর্থক ছিল। তবে একজন অনলাইন থেকে আগ্রহী ছিলেন, রিফাত ভাই। পূর্ণ নাম, ফাহিম শাহরিয়ার রিফাত। আরও কয়েকজন আলাপ করলেন। চিন্তা করলাম, হয়ত নকীব ভাই আর মাহির ভাইও অনলাইনে সহায়তা করতে পারবেন। তাই আমরা অনলাইনেও হ্যাকাথন আয়োজনের কথা চিন্তা করতে লাগলাম। কিন্তু তারা তাতেও সময় দিতে পারবেন না জানালেন। তখন আমি চাচ্ছিলাম, নথিপত্র অনুবাদের কাজ দিয়ে হলেও হ্যাকাথনের কাজ হোক। নথি অনুবাদের কথা দেখে কয়েকজন আগ্রহ দেখালেন। সিদ্ধান্ত ছিল, ১৪ তারিখ থেকে ১৬ তারিখ পর্যন্ত আমাদের অনলাইন হ্যাকাথন চলবে। আর ১৫ তারিখে আমাদের অফলাইন হ্যাকাথন অনুষ্ঠিত হবে। হ্যাকাথনের জন্য কার্যক্রমও নির্ধারিত হল। মূল কাজের ধারায় ছিল ফ্যাব্রিকেটরে খোলা থাকা বাংলা সংক্রান্ত যেকোনো টাস্ক। এছাড়া আমাদের লক্ষ্য ছিল, উইকিসংকলনের জন্য বাংলায় উপলব্ধ ফন্টগুলি মিডিয়াউইকিতে যুক্ত করা। উইকিপিডিয়ার খসড়া পাতা সংক্রান্ত কাজ করাও এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল। আরেকটা বিষয় ছিল, বাংলা ছোট উইকির জন্য টুইংকল শুরু করা। আমাদের কাজ তৈরি ছিল, উদ্যোমও তৈরি হয়ে গেল।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন কারণে অনুষ্ঠানের দিন পর্যন্ত সবার আগ্রহ তেমন ছিল না। বিশেষত উইকিসম্মেলন নিয়ে ব্যস্ততাই এর কারণ ছিল। আমি নিজেও উইকিসম্মেলন নিয়ে বেশ ব্যস্ত ছিলাম। তবুও ১৪ তারিখ নাগাদ অনলাইনে রিফাত ভাই কাজ শুরু করে দেন। আমিও দুয়েকটা কাজ গুছিয়ে নিলাম। এদিকে সেদিন দুপুরেই একটা অনানুষ্ঠানিক আলাপে শাকিল ভাই শিরোনাম পরিবর্তনের অনুরোধ নিয়ে একটা বিস্তর প্রস্তাবনা দিলেন। 

কথা ছিল, অফলাইন হ্যাকাথন আমরা ১৫ই নভেম্বর পুরো দিন করবো। কিন্তু দেখা গেল, স্ক্রিপ্ট জানেন, এমন লোকেরাও হ্যাকাথনে আসতে আগ্রহবোধ করছেন না। একজন তো আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমরা কি হ্যাকাথনে ডেভেলপমেন্টের কোনো কার্যক্রম শেখাবো কিনা। আমি অত্যন্ত নিরাশ হলাম। তবুও মৌলিকভাবে বেলা এগারোটার পর থেকে দিন শেষ হওয়া পর্যন্ত আমি হ্যাকথনের জন্য নির্দিষ্ট “আইভরি” কক্ষেই কাটিয়েছি। এরই মধ্যে ইশতিয়াক আব্দুল্লাহ ভাই আর মেহেদী আবেদীন ভাই এসে সহায়তা করতে শুরু করলেন। তারা জানালেন, কাজ কম জানলেও নথি ইত্যাদি অনুবাদে তারা সহায়তা করতে পারেন।

খানিক পরে ইয়াহিয়া ভাই জানালেন, শাকিল ভাইয়ের প্রদত্ত ধারণাটি তিনি বাস্তবে আনবেন। আমিও কাজে নেমে পড়লাম। আমার প্রথম কাজ ছিল, উইকিচ্যাটবট তৈরি করা। কিন্তু বাস্তবে তা করতে আমি ব্যর্থ হই। এদিকে কালপুরুষ ফন্টের জন্য ফ্যাব্রিকেটরে লাইসেন্স ঠিক করে অনুমোদনের আবেদন করি। বাকি অনেক ফন্টেরই লাইসেন্সে সমস্যা ছিল, তাই আপাতত সেগুলি বাদ দেই। কালপুরুষের ফন্টেও লাইসেন্সের সমস্যা ছিল। আমাদের সৌভাগ্য! কালপুরুষ ফন্টের ডেভেলপার সিয়াম ভাই সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন। তার সাথে প্রাথমিক আলাপ করে গিটহাবের প্রদত্ত লাইসেন্সে ফ্যাব্রিকেটরে আবেদন করি। এদিকে সম্মেলনের ওয়াইফাই সমস্যা শুরু করল। ইয়াহিয়া ভাই নিজের মোবাইল ডাটা ব্যবহার করলেন, আমার মডেম আমি বাড়িতে ফেলে এসেছি। ইশতিয়াক আব্দুল্লাহ ভাই তার মোবাইল ডাটা দিয়ে আমাকে সহায়তা করলেন।

ইয়াহিয়া ভাই যখন শিরোনাম প্রস্তাবনার কাজটি শেষ করেন, তখন বেলা শেষ হয়ে এসেছে। আমি তখন নিবন্ধ উইজার্ড নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। আমার কাজ তখনও শেষ হয়নি। আমার উপপাতায়ই ছিল। তবুও কাজটি একটা নির্দিষ্ট ক্ষেত্র পর্যন্ত পৌঁছে। এদিকে মেহেদী আবেদীন ভাই বৃহৎ ভাষার মডেল নীতিমালা ইত্যাদি অনুবাদ শেষ করেন। ইশতিয়াক আব্দুল্লাহ ভাই কয়েকটা নথি অনুবাদ করলেন। আমি এর আগে কমন্সে কয়েকটা কারিগরি পাতা অনুবাদ করেছিলাম।

আমরা ইতোমধ্যে সম্মেলনের জন্য ক্লান্ত ছিলাম। তাই আমরা ক্ষান্ত দিলাম। রাতে আমি অনলাইন হ্যাকাথনের অংশ হিসেবে আরও কিছু কাজ করি। কিন্তু সব মিলিয়ে খুব ভালো কাজ বের করতে পারিনি। আমি রাতেই পরদিনের জন্য নির্ধারিত প্রদর্শনী অনুষ্ঠানের উপস্থাপনা তৈরি করতে লেগে গেলাম। পরেরদিন আবার আমার প্রেজেন্টেশন ছিল। আমাকে প্রেজেন্টেশনের জন্যও তৈরি হতে ব্যস্ত হতে হল।

১৬ তারিখের অনুষ্ঠানে আমার প্রেজেন্টেশন শেষ করেই আমি অনলাইনে সবার সাথে যোগাযোগ করে কাজ জমা দেয়ার জন্য বললাম। যা-ই হয়েছে, উপস্থাপনা করতে হবে। আমাদের ছয়টা কাজ মৌলিকভাবে সমাপ্ত হয়েছিল, যার মধ্যে উইকিচ্যাটবট এপিআই ও কনফিগারেশনের সমস্যায় পড়েছে। তবুও এই কাজটিও উপস্থাপনায় যুক্ত করি। এছাড়া বাকি কাজগুলি বেশ সুন্দর মতই সমাপ্ত হয়েছিল। দুইটা কাজ প্রদর্শনীর সময়ে উপস্থাপনায় যুক্ত করা হয়নি। একটা হচ্ছে, ফন্ট নিয়ে আমাদের কাজ। আরেকটা কমন্সে আমাদের অনুবাদের কাজ। যদিও অনুবাদের জন্য মেহেদী আবেদীন ও ইশতিয়াক ভাইকে উল্লেখ করা হয়েছিল।

দুপুরের খাবারের পরই আমাদের হ্যাকাথন প্রদর্শনী শুরু হয়। ইয়াহিয়া ভাই ও শাকিল ভাই প্রথমে তাদের কাজের বিবরণ দেন। সেখানে যে শাকিল ভাই আর ইয়াহিয়া ভাইয়ের মধ্যে কৃতিত্ব নিয়ে বিশ্বযুদ্ধ হয়েছিল সেটা আমি কাউকে বলবো না। শেষপর্যন্ত প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরপর ব্রিটিশ সাম্রাজ্য যেভাবে উসমানীয় সাম্রাজ্যকে বেঁচে থাকতে সহায়তা করছিল, সেভাবেই উভয়ে উভয়কে কৃতিত্ব দিয়ে বিবরণ শেষ করেন। দূর্ভাগ্যবশত এই অংশটুকু রেকর্ড হয়নি।

তারপর আমি উপস্থাপনার জন্য এগিয়ে গেলাম। আমি নিবন্ধ উইজার্ড নিয়ে প্রথমে কথা বললাম। তারপর সংক্ষিপ্তভাবে ইয়াহিয়া ভাইদের কাজের কথা বললাম। এরপর আমার চ্যাটবটের আলোচনা আসল। আমি আশা করছিলাম (অথবা এখনো করছি) যে, চ্যাটবটটা কাজের হবে। এরপর রিফাত ভাইয়ের খসড়া নিবন্ধ পর্যালোচনার জন্য তৈরিকৃত স্ক্রিপ্ট নিয়ে আলাপ হল। এর মধ্যে আমি আমাদের কাজ না হওয়া ছোট উইকিগুলির জন্য টুইংকল গ্যাজেট নিয়ে কথা বললাম। এরপর আমি অনুবাদের জন্য ইশতিয়াক আব্দুল্লাহ ভাই ও মেহেদী আবেদীনের কথা উল্লেখ করি। সবশেষে মডিউল:ব্যানারের খোলস সম্পাদনা করার জন্য আবার রিফাত ভাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে আমার উপস্থাপনা শেষ করি।

উপস্থাপনার পরে নাহিদ সুলতান ভাই হ্যাকাথনে অংশ নেওয়া লোকদের ধন্যবাদ জানানোর পর কিছু প্রশ্ন করেন। এরমধ্যে একটা ছিল, আমাদের উইকিপিডিয়ার প্রধান পাতা আধুনিকীকরণ করা। আমি এরই মধ্যে এই কাজের প্রায় পুরোটা উইকিপিডিয়ায় করেছিলাম। আমি আমার উপপাতায় দৃশ্যটা দেখালাম। এই আলোচনার মাধ্যমে আমার উপস্থাপনা শেষ হয়।

এই পর্যন্ত আমাদের হ্যাকাথন হলেও ফ্যাব্রিকেটর ইত্যাদির কাজ আমাদেরকে চালিয়ে যেতে হয়। ফন্ট ও কমন্সে অনুবাদের কথা প্রদর্শনীতে যুক্ত করিনি, যেটা পরবর্তীতে ফাইলে যুক্ত করা হয়। এই ভুলসহ আরও কিছু ক্ষেত্রে বিষয়গুলি হয়ত উন্নত করা যেত। যেমন- আমরা কী কী কাজ করবো, সেটা আরও সুনির্ধারিতভাবে ঠিক করা যেত। এছাড়া কাজগুলি কে কোনটি করবে, সেটা যদি আগ্রহীরা আগেই নির্ধারিত করে নিতেন, তাহলেও ভালো হত। এছাড়া অনুষ্ঠানের ওয়াইফাইয়ের সমস্যাটা আমাদেরকে খুবই বিরক্ত করেছে ও কাজের মেজাজ নষ্ট করেছে। তবে সবিশেষে এই হ্যাকাথন প্রথম হিসেবে আমরা অনেক ভালো করেছি বলেই চিন্তা করি। যারা যারা পরিশ্রম, পরামর্শ ও অন্যান্য যেকোনোভাবে হ্যাকাথনকে সফল করতে কাজ করেছেন, সবাইকে আবারও ধন্যবাদ।

উইকিবার্তা
Translate »
Share This