উইকি লাভস বাটারফ্লাই। ছবি: মহীন রীয়াদ / সিসি-বাই-এসএ

ওপরের নামকরণ পড়ে আশাকরি সকলে বুঝতেই পেরেছেন যে আমি কোন বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে চলেছি। বিভিন্ন ঋতুতে আমাদের সকলেরই চারপাশে অনেক রকম সুন্দর সুন্দর রঙিন ডানা নিয়ে কিছু পতঙ্গকে উড়তে দেখি, আজ তাদের নিয়েই কিছু তথ্য আপনাদের সাথে আলোচনা করতে চলছি। কবি কাজী নজরুল তাঁর গানে লিখে গেছেন  “প্রজাপতি প্রজাপতি – কোথায় পেলে ভাই এমন রঙ্গীন পাখা” এবং কেনো লিখেছেন তা আলাদা করে আর ব্যাখ্যা করতে হবে না। এই সুন্দর প্রজাপতিদের কাছের থেকে যদি লক্ষ্য করা হয় তাহলে দেখা মিলবে বিভিন্ন রঙিন নকশা ও উজ্জ্বল আকর্ষণীয় বর্ণ। আমাদের সারা দেশে প্রায় ১৫০০ এর মত প্রজাতির হদিস পাওয়া গেছে যাদের মধ্যে বেশ কিছু আজ লুপ্তপ্রায়। আমাদের দেশের বিভিন্ন ভূ বৈচিত্র্যের মধ্যে এরা নিজেদের যেন ভাগ করে নিয়েছে – পাহাড়, সমুদ্র উপকূল, মালভূমি, সমভূমি ইত্যাদি স্থান গুলিতে পরিবেশের সাথে সুন্দর ভাবে তাল মিলিয়ে বসবাস করে চলেছে। 

ভারতবর্ষের মধ্যে বেশ কিছু অঞ্চলে এমন জায়গা আছে সেখানে পতঙ্গ প্রেমীরা খনি মনে করে থাকে। তারমধ্যে অরুণাচল প্রদেশ, আসাম, সিকিম, পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ু, মহারাষ্ট্র অন্যতম। এই সব রাজ্যের মধ্যে অরুণাচল প্রদেশে সবচেয়ে বেশি প্রজাতির প্রজাপতি দেখতে পাওয়া যায় যার সংখ্যা ভারতে প্রাপ্ত মোট প্রজাতির প্রায় ৫০ শতাংশ (প্রায় ৭০০ টিরও বেশী)।

এরপর আমার কিছু নিজস্ব অভিজ্ঞতা নিয়ে আলোচনায় আসছি। প্রথমেই বলে রাখি আমি উইকিমিডিয়ার বিভিন্ন প্রকল্পের একজন সক্রিয় অবদানকারী এবং উইকি লাভস বাটারফ্লাই প্রকল্পের মাধ্যমেই আমি বিভিন্ন রিমোট অঞ্চলের প্রজাপতি অনেক কাছে থেকে দেখার সুযোগ পাই এবং দেখার সাথে সাথেই আমি তাদের ফ্রেম বন্দি করতেও ভালবাসি। 

উইকি লাভস বাটারফ্লাই একটি বিজ্ঞানভিত্তিক অনুসন্ধান এবং প্রজাপতি সংক্রান্ত ফটোগ্রাফিক ডকুমেন্টেশনের উদ্যোগ। এটি উইকিমিডিয়া ফাউন্ডেশনের অনুদানপ্রাপ্ত এবং পশ্চিমবঙ্গ উইকিমিডিয়ান ইউজার দলের সহযোগিতায় পরিচালিত। প্রকল্পটি অনন্যা মন্ডল কর্তৃক শুরু হয় এবং বর্তমানে এটি তার সপ্তম পর্যায়ে রয়েছে। এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য হলো প্রজাপতির উপর ভিত্তি করে তথ্য ও ফটোগ্রাফ যোগ করার মাধ্যমে উইকিমিডিয়া কমন্সে জ্ঞানভাণ্ডার বৃদ্ধি করা এবং উইকিমিডিয়া প্রকল্পের সাথে সংযুক্তি বাড়ানো। সর্বোপরি সমমনা ব্যক্তি, ছাত্রসমাজ এবং প্রজাপতি বিশেষজ্ঞদের একত্রিত করে একটি জ্ঞানভিত্তিক বাস্তুতন্ত্র গঠন করা। এই প্রকল্প প্রজাপতির সংরক্ষণে অবদান রাখার পাশাপাশি নাগরিক বিজ্ঞান এবং প্রজাপতি সংক্রান্ত গবেষণাকে উৎসাহিত করছে না, বরং উইকিমিডিয়া কমন্সে অবদান রাখতে আগ্রহী ব্যক্তিদেরও একটি সহযোগিতামূলক জ্ঞানভিত্তিক এবং গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। সক্রিয় অবদানকারীরা অনন্যা দিদির নেতৃত্বে ভারতবর্ষের পশ্চিমবঙ্গ, উড়িষ্যা  এবং উত্তর- পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলিতে অবস্থিত বিভিন্ন অভয়ারণ্য, জাতীয় উদ্যান, জঙ্গল এবং বাটারফ্লাই হটস্পট এ গিয়ে সেখানে প্রাপ্ত প্রজাপতিদের ছবি তুলে আনেন এবং প্রাপ্ত ফটোগ্রাফগুলো উইকিমিডিয়া কমন্সে মুক্ত লাইসেন্সের আওতায় আপলোড করা হয়, যা যে কেউ ব্যবহার করতে পারে। ২০২৩ সালে সেপ্টেম্বর মাসে পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলাতে উইকি লাভ বাটারফ্লাই একটি ফটোওয়াক এর আয়োজন করে, আমি সোশ্যাল মিডিয়াতে এই ইভেন্টের কথা জানতে পেরে সেই ফটোওয়াকে অংশগ্রহণ করি এবং সেই সাথেই আমার উইকিমিডিয়ার পথ চলা শুরু হয়। 

ওডিনা ডেকোরেটাস। ছবি: অঙ্কিত গোস্বামী / সিসি-বাই-এসএ

এবার আগের প্রসঙ্গে ফিরে আসি আমি ২-১ বার প্রজাপতির সন্ধানে অরুণাচল প্রদেশের উদ্দেশ্যে পাড়ি দিয়েছিলাম। সাধারণত বর্ষার আগে ও পরের সময় কালকে প্রজাপতি দেখার জন্য সব থেকে উপযুক্ত সময় বলা হয়ে থাকে আর ভাগ্যক্রমে আমি প্রজাপতির এই সুন্দর রাজ্যে দুটি সময়েরই সাক্ষী হতে পেরেছি। প্রথমে নামদাফা ও দ্বিতীয় বার কামলাঙ এই দুই জাতীয় উদ্যানে ভিন্ন ভিন্ন রঙিন পাখনা যেন মন জুড়িয়ে দিয়েছে। 

নামদাফা জাতীয় উদ্যান ছিল আমার জীবনে পাহাড়ের বুকে প্রথম পদার্পণ। চাংলাং জেলার মিয়াও শহর থেকে নামদাফা জাতীয় উদ্যানের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছিলাম। গাড়ি যত দেবান ক্যাম্প-এর দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল আমার উৎসাহ তত বাড়ছিল। চারিদিকের সেই সবুজ জঙ্গল তার মায়াবী সৌন্দর্যের সাথে আমাদের আমন্ত্রণ জানাচ্ছিল। প্রজাপতি এবং প্রকৃতি চর্চার অনন্য স্বর্গরাজ্যে গিয়ে পড়লাম আমি দুচোখে অপার মুগ্ধতা নিয়ে। সারাক্ষণ ইতি উতি অগণিত প্রজাপতির আনাগোনা সাথে ছিল পাহাড়ি পাখির ডাক, মাথার ওপর ২-৩ প্রজাতির ধনেশ পাখি ওড়ার শব্দ এবং সকালে হুলক গিব্বনের ডাক। তিন দিনের মধ্যে আমি প্রায় ৮০ টিরও প্রজাপতি দেখেছিলাম এবং ছবি তুলেছিলাম, তাদের মধ্যে কিছু প্রজাতি ভারতীয় বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ তালিকার অন্তর্ভুক্ত ছিল, যেমন – নাগা ক্যাবেজ হোয়াইট, জিগজ্যাগ ফ্ল্যাট, ব্যান্ডেড টিট ইত্যাদি।

ছবি: অঙ্কিত গোস্বামী / সিসি-বাই-এসএ

প্রথম বার অরুণাচল প্রদেশে ভ্রমণে যে শুধু প্রজাপতিই দেখেছি তা কিন্তু না। প্রজাপতি দেখার সাথে সাথে সেখানের অনেক স্থানীয় মানুষের সাথে আলাপ হয় এবং তাদের সাথে আলাপ-আলোচনায় সেই জায়গা সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারি। এর সাথে ছিল চোখ এবং মন জুড়ানো দৃশ্যপট যার সাক্ষী শুধু মাত্র আমার চোখ আর মন কারণ সেই বিশাল সৌন্দর্য আমি ক্যামেরা বন্দি করতে পারিনি। মেঘ-পাহাড়ের নিত্য লুকোচুরি আর দিগন্তব্যাপী সবুজের সমারোহ মনকে বিহ্বল করে রেখেছিল সেই কয়েকটা দিন। প্রকৃতিরাণীর অনিমেষ সৌন্দর্য্য স্নাত এবং প্রজাপতির রঙিন পাখার রঙ্গোলীতে মন রাঙিয়ে ঝোলাভর্তি সুখ স্মৃতি নিয়ে ঘরে ফেরা। 

ছবি: অঙ্কিত গোস্বামী / সিসি-বাই-এসএ

এর বেশ কিছুদিন পরে, উইকি লাভস বাটারফ্লাই প্রকল্পের সূত্রেই আবার অরুণাচল প্রদেশে ফিরে যাবার সুযোগ হাতে চলে এলো তবে এবার কিন্তু আর নামদাফা নয়, গন্তব্য কামলাঙ জাতীয় উদ্যান, সঙ্গী ছিল সৌভিক মুখার্জী। প্রথমে লোহিত জেলার ওয়াকরো শহরে গিয়ে উঠেছিলাম। পৌঁছতে পৌঁছতে প্রায় সন্ধ্যে নেমে আসায় ঐদিন আমাদের আর বেরোনো হলনা, তবে পরের দিন সকালেই রওনা হলাম কামলাঙ জাতীয় উদ্যান এর উদ্দেশ্যে, সাথে ছিলেন সেখানকার রেঞ্জার সাহেব এবং কিছু ফরেস্ট স্টাফ। এই বারও অরুণাচল প্রদেশের জঙ্গল আমায় হতাশ করেনি, শুরু হলো রঙিন ডানার বাহার। তবে এইবার ২-৩ টে দিন আবহাওয়া আমাদের সাথে সামান্য বিমুখ করায় সেই দিনগুলো আমাদের ফরেস্ট গেস্ট হাউস এর মধ্যেই কাটাতে হয়। কিন্তু, বাকি দিনগুলিতে মন ভরে প্রজাপতি দেখেছি এবং ছবি তুলেছি। এইবার আমরা প্রায় ৯০ টিরও বেশি প্রজাতির প্রজাপতি দেখেছি এবং ছবি তুলেছি তবে তা শুধু কামলাঙ – এ নয়, আশপাশেও কিছু ভালো জায়গা ঘুরেও ছবি সংগ্রহ করেছি। তাদের মধ্যে বেশ কিছু ভারতীয় বন্য প্রাণ সংরক্ষণের তালিকার অন্তর্ভুক্ত। মন প্রাণ ভরে ছবি তুলে এবং চারিদিকের অবর্নণীয় দৃশ্যকল্প উপভোগ করে একটা আলাদা অভিজ্ঞতাই অর্জন করেছি। 

কালি পাংখা। ছবি: সৌভিক মুখার্জী / সিসি-বাই-এসএ

অরুণাচল প্রদেশের এরূপ উন্নত জীব বৈচিত্র্য হওয়ার পিছনে, আমার মতে কারণগুলি হল স্বল্প জনবসতি এবং জনঘনত্ব, স্থানীয় মানুষজনের স্বতঃস্ফূর্ত বন্যপ্রেম, বনদপ্তরের নিপুণ দায়বদ্ধতা এবং রক্ষণাবেক্ষণ ইত্যাদি। ওই জায়গার মানুষ জন যেন প্রকৃতির সাথে এক গভীর সম্পর্ক স্থাপন করে জীবনযাত্রা অতিবাহিত করে। অরুণাচল প্রদেশের ভূ বৈচিত্র্য, অপরূপ বন্যপ্রাণ, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ছাড়াও আরও একটা বিষয়ে আমার মন জয় করেছে, তা হলো সেখানের মানুষজন, তাদের সাথে নানান বিষয়ে আলোচনা হয়েছে এবং প্রত্যেকে বিভিন্ন ভাবে আমায় প্রজাপতির সম্পর্কে নানান তথ্য দিয়েছেন যা আমার কাছে অজানা। এতগুলো কারণ আমার চোখে বিশেষ স্থান অধিকার করেছে, বিভিন্ন মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন হওয়ায় আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি অন্যদের দৃষ্টিতে যারা পূর্বে অরুণাচল প্রদেশে ঘুরে এসেছে তাদের কাছে আরো অনেক সুন্দর অভিজ্ঞতা আছে।

উইকিবার্তা
Translate »
Share This