সুব্রত রায়। ছবি: দোলন প্রভা/ সিসি-বাই-এসএ ৪.০

১৪ নভেম্বর, ২০২৪ ইং তারিখ, বৃহস্পতিবার, বেলা ২:০০টায় পূর্ব নির্ধারিত ও বহুল প্রতীক্ষিত দিনে পুরো ব্যাগ ভর্তি নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত পোষাকাদি নিয়ে গাজীপুরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিই। সাথে অবশ্য আরও দুটি ভারী উপহার ছিল। উদ্দেশ্য ছিল মূলত উইকিপিডিয়ানদের সাথে মতবিনিময় করা ও দোলন প্রভাকে উদ্দেশ্য করে স্বীয় তনয়া শ্রেয়সী হিয়া রায়ের অঙ্কিত স্কেচ হস্তান্তর করা। পরবর্তীতে, অবশ্য সন্দীহান চিত্তে নিজের অঙ্কিত ভারতীয় উইকিপিডিয়ান নেট্টিম সুজাতা’র স্কেচ প্রদানও এতে যুক্ত হয়। এছাড়াও, উইকি প্রশাসকদের আলোচনা সভা, পুল ও টেবিল টেনিস খেলা, সাঁতার কাটাও এ আগ্রহের সাথে যুক্ত হয়েছিল। তবে, শেষ দুটি বিষয় বাদে বেশ সার্থকতা ও পরিপূর্ণতা লাভ করেছিল। শুরুতেই বলে নেই যে, এ আত্মকথনটি সময় ও প্রস্তুতিপর্বকে প্রাধান্য দিয়ে তিনটি অংশে বিভক্ত করেছি। যানজটের কারণে কমপক্ষে হলেও আড়াই ঘণ্টা বিলম্বে গন্তব্য স্থল ড্রিম স্কয়ার রিসোর্টে পৌঁছুতে সক্ষম হই। তখন রাত প্রায় সাড়ে আটটা ছুঁই ছুঁই করছে। অর্থাৎ, সর্বসাকুল্যে এ ভ্রমণে সাড়ে ছয় ঘণ্টা ব্যয়িত হয়; যদিও সময় লাগতো চার ঘণ্টা। যাতায়াতের নিত্য সমস্যা যানজটের কবলে পরে একবার মনে হয়েছিল নিবন্ধন না করলেই বোধহয় ভালো হতো। তবে, গাজীপুরে ঘনিষ্ঠ বন্ধু মনোয়ার হোসেন আকন্দের বৈকালিক সাহচর্য্য ও মিনিবাসে জনৈক যাত্রীর আসন ছেড়ে বসার ব্যবস্থার বিষয়টি স্মরণীয় হয়ে থাকবে বৈকি! পাশাপাশি, এ ভ্রমণে অন্যতম সঙ্গী রেডমি নোট ৮-এর ভূমিকাও নেহায়েত কম ছিল না। নিয়মিতভাবে পারিবারিক যোগাযোগ ও ঢাকায় নিটোরে অবস্থানরত সন্তান সুপ্রিয় দীপ রায়; মনোহরদীর নারায়ণ মোহন সরকার; প্রিয় বন্ধু ও উইকিপিডিয়ান আশিক শাওন ও ফেরদৌস ভাইয়ের ফোন, চ্যাট, ছবি প্রেরণের বিষয়টিও অনেকাংশে ভ্রমণকালীন ক্লান্তি দূর করে দিয়েছে। এ ভ্রমণে রিক্সা, বাস, সিএনজি, অটোরিক্সায় আরোহণ করি। আর, মাঝে-মধ্যে বিরতিতে রং চা, দুধ চা আর সিগারেট তো জীবনের নিত্য অংশ হিসেবে গ্রহণ করেছি অবলীলাক্রমে। ইটাখোলা থেকে চরসিন্দুর ব্রীজে গমন করি, তখন প্রায় তিনটা। এর পূর্বে সিলেটবাসী আশিক ভাই যোগাযোগ করে কুশল বিনিময়পূর্বক স্বীয় অবস্থান ব্যক্ত করি। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে গাজীপুরের শহীদ মিনার এলাকায় ঢাকা গভর্নমেন্ট কমার্শিয়াল ইন্সটিটিউটের ১৯৮৬ সালের উচ্চ মাধ্যমিক সমমান স্তরের (ডিপ-ইন-কম) সহপাঠী ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু মনোয়ার হোসেন আকন্দের সাদর আতিথেয়তার কথা স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর সাথে কিছুটা সময় কাটাই। গাজীপুরের সিএনজির রঙ তামাটে বর্ণের যা এলাকার স্বকীয় পরিচিতির কথা জানান দেয়। অথচ, নিজ জেলা নরসিংদীর সিএনজি সবুজাভ। প্রায় ঘণ্টাখানেক ইয়ারফোনে গান শোনা, নৈসর্গিক দৃশ্যাবলী ধারণ, ফাঁকা ও নিরিবিলি রাস্তায় বেশ লাগছিল। অদ্ভূত আনন্দ, চাপা উত্তেজনায় প্রথমবারের মতো গাজীপুর সদরে গমনের বিষয়টি বেশ উৎফুল্ল হয়ে পড়ে দেহ-মন-প্রাণ; তবে, সংযত ছিলাম। চা-নাস্তা, গল্পগুজব, পারিপার্শ্বিক প্রেক্ষাপট, সমাজ বাস্তবতায় ব্যস্ত ছিলাম, অন্য জগতে চলে যাই। বন্ধুর সাথে ফটোসেশন, সেলফির কোন কমতি ছিল না। একত্রে বেশ কিছুটা রাস্তা হেঁটে ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখ, স্মৃতিচারণ করতে করতে জয়দেবপুর রেলওয়ে স্টেশনের রেলক্রসিং অতিক্রম করি। নতুন কিছু চোখে পড়লেই জীবনের অন্যতম সাথী রেডমি নোট এইটে স্মৃতি সংরক্ষণে এগিয়ে থাকি সদাসর্বদা ও সবসময়। সহজ যোগাযোগ হিসেবে শালনা বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছি সন্ধ্যেয়। এরপর, মাওনা ব্রিজের নিচে পৌঁছি, যদিও রাস্তায় বেশ যানজট ছিল। অনেকটা দুরুদুরু বুকে প্রথমবারের মতো অজানা-অচেনা জায়গায় পৌঁছি। আবারও, চা বিরতি নেই। চা-সিগারেট খেয়ে অটোরিক্সায় উঠি। থেমে থেমে চলতে থাকে গাড়ীটি। এক পর্যায়ে স্থানীয় বাজারের সরু রাস্তায় বেশ স্থবিরতা আসলে বেশ অসহায় মনে হতে থাকে। গাড়ী কিছুতেই এগুতে চায় না। কিন্তু, কাছাকাছি এসে ড্রিম স্কয়ার রিসোর্টের ঠিকানা ও নাম দেখেই ইতঃস্তত মনটা ক্রমশঃ শান্ত হতে থাকে।

দ্বাররক্ষক আমার পরিচয় নিয়ে অভ্যর্থনাকেন্দ্রের অবস্থান জানায়। রঙিন ঝলমলে পরিবেশ, আলোকজ্জ্বল, নিরিবিলি এলাকায় পৌঁছে বেশ বিমোহিত হয়ে পড়ি। রিসোর্টের অবস্থান সম্পর্কে বেশ পূর্বেই উইকিমিডিয়া বাংলাদেশের সভাপতি ও কর্ণধার জনাব শাবাব মুস্তাফা ভাই ধারণা দিয়েছিলেন। ছবি তুলতে কার্পণ্য করিনি। অভ্যর্থনাকেন্দ্রে উইকিপিডিয়ান মুকিতের সাথে মতবিনিময় করি। মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় স্থির নিশ্চল হয়ে পড়ি। পরিচিতি নিশ্চিতকল্পে এনআইডি প্রদর্শন, ফোন নম্বর ইত্যাদি প্রদানের মাঝেই শামীম নামীয় ওয়ার্ডবয় রঙিন পানীয় প্রদান করে। কক্ষ নং ১০৩-এর বায়োমেট্রিক্স আইডি কার্ড পাই। কক্ষের সঙ্গী হিসেবে রয়েছেন আসামের বাবুল বৈশ্য। তিনিও ধূমপায়ী এবং স্বল্পভাষী। আঁকা-বাঁকা রাস্তায় ছোট্ট গাড়ীতে বসি ও শামীম আমায় নিয়ে যেতে থাকে। রকি ও মহীন রীয়াদের সাথে দেখা হলে জায়গায় অনুষ্ঠিতব্য সম্মেলনের অবস্থান সম্পর্কে আরও নিশ্চিত হই। বেশকিছু ছবি উঠাই। পথিমধ্যে অনেক কিছু জানা-অজানা তথ্যাদি বিনিময় করি। আঁকা-বাঁকা পথে কোথা থেকে কোথা যে এলাম ভেবেই পাচ্ছিলাম না। নিখুঁত, পরিপাটি, নিস্তব্ধ-নিরিবিলি পরিবেশে অবস্থান করি যা একেবারেই অস্বাভাবিক লাগছিল। লেকের পানিতে মাঝে-মধ্যে মাছের ঝাপটা অন্যতম বিষয় ছিল। চতুর্দিকে আলোকচ্ছটা পরিবেশে মাঝ-মধ্যে শৃগাল দর্শন ও হুক্কা-হুয়া আওয়াজে গ্রামীণ পরিবেশের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। 

রুমে ঢুকে তো চক্ষু আরও ছানাবড়া। উজ্জ্বল আলোয় অত্যন্ত সুন্দর ছিল বিষয়টি। কক্ষে কি কি করা যাবে ও যাবে না তা ওয়ার্ডবয় আমায় জানায়। তবে, ধূমপানের বিষয়ে ক্ষাণিকটা নিষেধাজ্ঞা ছিল। অর্থাৎ, কক্ষে ধূমপান করলেই সতর্কতা সংকেত বেজে উঠবে। স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিদ্যুৎ বন্ধ, টেলিভিশন, ইলেকট্রিক হিটারে চা-কফির আয়োজন, টয়লেট ঠাণ্ডা/গরম পানির ব্যবস্থা, জরুরী সেবা, ওয়াই-ফাই পাসওয়ার্ড (ড্রিমওয়ানটুথ্রি) ইত্যাদি বিষয়ে অবগত হই। দূর্ভাগ্যবশতঃ, অত্যন্ত ব্যস্ততার মাঝে টেলিভিশন দেখার সুযোগই পাইনি। রাতের খাবার গ্রহণের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেই। চিরপরিচিত শাবাব ভাইসহ পরিচিত সকল উইকিপিডিয়ানের সাথে মিলিত হই। অন্তরে প্রাণ ফিরে পাই। বুফে ডিনারে রঙ-বেরঙের মনমতো দেশী-বিদেশী খাবারের ব্যবস্থা ছিল। নিজে সংযত ছিলাম। তবে, পছন্দ করতেই বেশ সময় কেটে যায়। খাদ্য তালিকায় কি না ছিল! ভাত-পোলাও, বিরিয়ানি, মাছ-মাংস-ডাল, চাটনি, দই ইত্যাদি। অল্প অল্প করে প্রয়োজনীয় খাবার নিলেও এরপর মিষ্টিজাতীয় খাবার রয়েছে। এ পর্বে অবশ্য মিষ্টিজাতীয় খাবার থেকে নিজেকে বিরত রাখতে পারিনি। পূর্ব পরিচিত আদর্শ লেখক অনুপ সাদি, কবি দোলন প্রভাসহ আরও এক নতুন নারী উইকিপিডিয়ান রাবিবার সন্ধান পাই। আরও সন্ধান পাই আশিক শাওন ও তাঁর কন্যা সন্তানকে পেয়ে। তবে, বারবারই বিমর্ষ হয়ে পড়ি একই দৃষ্টিভঙ্গীর অধিকারী ও ২০১৫ সালে ঢাকার ওয়াইএমসিএতে একই কক্ষে অবস্থানকারী ফেরদৌস ভাইয়ের অনুপস্থিতির বিষয়ে (তিনি অভিজ্ঞতার কথা তাঁর উপ-পাতায় তুলে ধরেছিলেন)। তিনি নাকি ব্যক্তিগত কারণে নিজেকে এ সম্মেলনে থেকে প্রত্যাহার করে নেন। সর্বমোট ৫৬ জন উইকিপিডিয়ান এ সম্মেলনে অংশ নেন। আর, সকলের নিরাপত্তার স্বার্থে সম্মেলন শেষ না হওয়া পর্যন্ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ আয়োজনের কথা গোপনীয়তার সাথে রক্ষা করার জন্যে টেলিগ্রাম গ্রুপে বলা হয়।

অনুষ্ঠানের পূর্বে গুগল ফর্মে ‘শনিবার রাত্রে থাকতেও পারি, আবার নাও থাকতে পারি’ – কথাটি লিখি। পরবর্তীতে, মাসুম আল হাসান রকি ভাই ফোনে যোগাযোগ করে শনিবার রাত্রে থাকার কথা নিশ্চিত করেন। শনিবার বিকেলে চলে যাবার সম্ভাবনা ছিল। এরপর সিদ্ধান্ত পাল্টে রবিবার ভোরে রওয়ানা দিয়ে সকালে কর্মস্থলে যোগদানের ঝুঁকি নেই। স্পাইস রেস্টুরেন্ট অর্থাৎ খাবার কক্ষের বাইরে শাবাব ভাই জানালেন ভারতের আসামের বাংলাভাষী উইকিপিডিয়ান বাবুল বৈশ্য আমার কক্ষে সঙ্গী হিসেবে অবস্থান করবেন। তবে, প্রত্যেক রুমেই একটি করে বায়োমেট্রিক্স এবং একটিমাত্র আলমারী রয়েছে। ফলে, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা আর থাকে না। এক পর্যায়ে পরদিন অর্থাৎ, বাংলা উইকিসম্মেলনের প্রথমদিনের সকালের অধিবেশনের শুরুর দিকে পাঁচ-সদস্যের ‘বাংলা উইকিপিডিয়ার প্রশাসকদের প্যানেল আলোচনা’ সভার প্রস্তুতিকল্পে রিয়াজ, ইয়াহিয়া, শাকিলের সাথে রাত দেড়টা পর্যন্ত আলাপচারিতায় মগ্ন হই। ঐশিক রেহমান পরদিন সকালে সম্মেলন কেন্দ্রে আসে। লিজেন্ড মিটিং রুমে অংশগ্রহণকারী এ পাঁচজন প্রশাসকের অন্যতম ও বয়োজ্যেষ্ঠ ছিলাম আমি। নিজস্ব ধ্যান-ধারণাগুলোর ব্যাখ্যা দেই। স্বীয় দৃষ্টিভঙ্গী তুলে ধরার [বাংলা উইকিপিডিয়ার প্রশাসকদের প্যানেল আলোচনা] সভাটি উইকিসম্মেলনের অনুষ্ঠানসূচির অন্যতম বিষয় ছিল। এর পূর্বে বাবুল বৈশ্যের কাছে রুমের কার্ড দেই। গভীর রাতে কক্ষে ফিরলেও বাবুল বৈশ্য ব্যস্ত ছিলেন। আরও কিছুটা সময় মতবিনিময় করি। এসি কক্ষে বেশ ঠাণ্ডা অনুভূত হলেও পূর্বে রক্ষিত কম্বল ব্যবহার করি ও ব্যক্তিগত ২৪ বছর পূর্বেকার বিয়ের চাঁদরটি ব্যবহারের প্রয়োজন পড়েনি। সঙ্গে ডায়াবেটিসের ঔষধ আনলেও একবারই গ্রহণ করি। পরবর্তী দুইদিন বেমালুম ভুলে যাই। ব্যস্ততার মাঝে পরের দুইদিন বিষয়টি একেবারেই বিস্মৃত ছিলাম। কোন ফাঁকে যে সকাল হয়ে গেল টেরই পাইনি। তবে, মধ্যরাতে বাবুল দা’র মোবাইলের আওয়াজে ঘুম ভেঙ্গে ঘুমে বেশ ব্যাঘাত ঘটায়।

সকালের নাস্তা গ্রহণের পরপরই দ্বিতীয় তলায় সম্মেলনের প্রথম পর্বে অংশগ্রহণ করি। পাটের ব্যাগ, ফ্লাস্ক, কালো টি-শার্ট পাই। মোট ৫৬ জন নারী-পুরুষ, ছাত্র-ছাত্রী, বিভিন্ন পেশাজীবীর অংশগ্রহণে হলরুমটিতে পিনপতন নীরবতা ছিল। সম্মুখসারির টেবিলের একপ্রান্তে বসি। এরফলে, কথা বলতে, ছবি তুলতে, বাইরে যেতে বিভিন্নভাবে সহায়তা করে। তখন বয়োজ্যেষ্ঠ উইকিপিডিয়ান ও ঢাকা যাদুঘরের সাবেক মহাপরিচালক জনাব ফয়জুল লতিফ চৌধুরী বক্তব্য রাখছিলেন। এর পরপরই [বাংলা উইকিপিডিয়ার প্রশাসকদের প্যানেল আলোচনা] সভাটি শুরু হয়। বিভিন্ন বিষয়াদি নিয়ে মডারেটরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া রিয়াজ ধীরলয়ে শুরু করলেও পরবর্তীতে তা বেশ প্রাণবন্তঃ রূপ ধারণ করে। বিভিন্ন বিষয় চলে আসে। নবীন প্রশাসকদের ভূমিকা সবিশেষ প্রশংসনীয় ও যুক্তি নির্ভর ছিল। স্বীয় দৃষ্টিকোণে এ ধরণের অনুষ্ঠানে উপস্থিত সকল প্রশাসকের অংশগ্রহণ কাম্য ছিল। এরফলে আরও বৈচিত্র্যময় হওয়াসহ সাধারণ ব্যবহারকারীদের কাছাকাছি চলে যাওয়া ও ভীতি দূর করা যেতো। প্রথমদিনের সম্মেলনের সম্পূর্ণ সময়টুকু ইউটিউব চ্যানেলে সীমিত আকারে সরাসরি সম্প্রচারিত হলেও দ্বিতীয় দিন তা অনুপস্থিত ছিল। একের পর এক নির্ধারিত বিষয়ের আলোচনা চলতে থাকে। পার্শ্ববর্তী আইভরি মিটিং রুমেও উইকিউপাত্তের আয়োজন হয়। ফলে, একই সময়ে একাধিক অনুষ্ঠান আয়োজনের ফলে পূর্ণ স্বাদ আস্বাদন করতে পারিনি। ফাঁকে ফাঁকে সময় পেলেই নিজে কিংবা সতীর্থদের আন্তরিক সহযোগিতা নিয়ে ফটোসেশন, সেলফিতে অংশ নিতে থাকি। সম্মেলন শেষে দেখি যে প্রায় আটশত ছবি ও ভিডিও মোবাইলে ধারণ করতে পেরেছি। পরবর্তীতে, প্রায় এক মাস পর ছবি ও ভিডিওগুলো উইকি কমন্সে আপলোড করি প্রায় তিন দিন সময় নিয়ে। বেশ কয়েকটি ফাইল অবশ্য নীতিমালা ভঙ্গের কারণে মুছে ফেলা হয়। এক ফাঁকে ‘সুইট টেবিল’ থেকে ঐচ্ছিকভাবে আনয়ণকৃত মিষ্টিজাতীয় খাবারের কিয়দাংশ গ্রহণ করি। 

প্রশাসকদের প্যানেল আলোচনা। ছবি: দেলোয়ার আকরাম / সিসি-বাই-এসএ ৪.০

দুপুরে এক পর্যায়ে দোলন প্রভাকে অত্যন্ত গোপনীয় নেট্টিম সুজাতা’র স্কেচের কথা জানাই। দুপুরে কক্ষে ফিরে চা খাবার পর বারান্দায় দোলন প্রভা একগুচ্ছ উপহারসামগ্রী নিয়ে আসেন। স্বীয় তনয়া শ্রেয়সী হিয়া রায়ের পার্স ছাড়া সবগুলোই ছিল তাঁর কিংবা অনুপ সাদি রচিত পুস্তিকা ও নেত্রকোণা জেলা চরিতকোষ বই। রাতেই ম্যাসেঞ্জারে পার্সের ছবিটি পাঠিয়ে দেই। গত এপ্রিলে দোলন প্রভা সংখ্যার প্রচ্ছদ চিত্রে উজ্জ্বীবিত হয়ে স্কেচ অঙ্কন করে শ্রেয়সী হিয়া রায়। ফেসবুকের পোস্ট দেখে দোলন প্রভা তা পাবার কথা জানায়। নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি। তবে, অনুষ্ঠানে উপহারসামগ্রী হস্তান্তরের বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেন। হঠাৎ, সামনে চলে এলেন কলকাতা থেকে আগত নেট্টিম সুজাতা, আসামের প্রণামিকা অধিকারী, নেপালী হিমল সুবেদী ও অত্যন্ত প্রিয় দেলোয়ার আকরাম। তাঁদেরকে নিয়ে বিভিন্নভাবে ফটোসেশনে অংশ নেই। অপরদিকে, খেয়ালী মন থেকে ও সম্মেলনের বৈচিত্র্যতা আনয়ণে উইকিসম্মেলনের অন্যতম অংশগ্রহণকারী নেট্টিম সুজাতা’র (তাঁকে নেটটাইম সুজাতা ছদ্মনামেই জানতাম) স্কেচ আঁকি। অনেকটা বৈচিত্র্যময় পরিবেশ ও তাক লাগানো কিংবা হতবাক করার স্বার্থে বিষয়টি সঙ্গোপন রাখি; কেবলমাত্র দোলন প্রভাকে জানাই।

নেট্টিম সুজাতা, সুব্রত রায় ও দোলন প্রভা ছবি: সুব্রত রায়

মাঝে-মধ্যে কক্ষে ফিরে আসি। অনুষ্ঠানের এক ফাঁকে দোলন প্রভাকে স্কেচগুলো হস্তান্তরের কথা বলি। ভালো নিবন্ধ প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করি। এ পর্বে অংশগ্রহণের পূর্বে মোবাইলে ভিডিও ধারণের পাশাপাশি অনেকগুলো ছবি তুলে সহযোগিতার হাত প্রশস্ত করে সতীর্থ উইকিপিডিয়ানরা। পুরস্কারের প্যাকেটসহ একটি লোগোসমৃদ্ধ গ্লাস উপহার হিসেবে পাই। তবে, রবিবার দিন বাড়ীতে ফিরে বিছানায় ব্যাগ রাখলেও স্বীয় তনয়া দুর্ভাগ্যজনকভাবে গ্লাসটি ভেঙ্গে ফেলে যা বাজার থেকে ফিরে এসে দেখি। বিকেলের অধিবেশন শেষে স্কেচ বিতরণের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ আসে। অনানুষ্ঠানিক এ পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানটি মূলত একাই পরিচালনা করি। এ পর্বে মাসুম আল হাসান রকি, শাবাব মুস্তাফা, দোলন প্রভা, নেট্টিম সুজাতা ও মুরুব্বিয়ান ফয়জুল লতিফ চৌধুরী সর্বাত্মক সহায়তা করেন। প্রথমে দোলন প্রভা ও পরবর্তীতে নেট্টিম সুজাতাকে বাঁধাইকৃত স্কেচ দুটি হস্তান্তর করি। তন্মধ্যে, নেট্টিম সুজাতাকে লক্ষ্য করে অঙ্কিত স্কেচের স্মারক উপহারের বিষয়টি সকলকে বিস্মিত ও হতচকিত করে তুলে। নিজেকে ধন্য মনে করি ও ভারমুক্ত হই। কেননা, এগুলো অক্ষত অবস্থায় দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাগে রক্ষিত ও বেশ ভারী ছিল। সান্ধ্যকালীন চা বিরতির পর বাবুল বৈশ্যকে নিয়ে রিসোর্টের বাইরে যাই সিগারেট ক্রয়ের উদ্দেশ্যে। উভয়েই সিগারেট কিনি। বেশ স্বাভাবিক লাগছিল। অনেকটা খাঁচায় রাখা বন্দী দশা থেকে মুক্ত পাখির মতো। রিসোর্টে ঢোকার মুহূর্তে আবারও রাস্তায় অনেকখানি হাঁটি ভারতীয় অন্য উইকিপিডিয়ান – তরুণ সামন্ত, অবাঙমেয় নামে পরিচিত সুরজিৎ ঘোষের সাথে। এক পর্যায়ে রিসোর্টে ফিরে আসি। রাতের উজ্জ্বল আলোয় অনেকেই দ্বিতীয় পছন্দের ফুটবল খেলায় অংশ নেয়। তবে, নিজেকে যুক্ত রাখিনি। কেননা, ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত। কোন কারণে আঘাত কিংবা কেটে গেলে শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারি। একটি ছবিও স্মৃতি হিসেবে রেখে দেই। আর. কে. হান্নান ওরফে সুফি’র সাথে অনেক পূর্ব থেকেই পরিচয়। আমার কক্ষে কিছুক্ষণ অবস্থান করে। এক ফাঁকে দুটি ছবি ধারণ করি।

চা বিরতিতে আড্ডা। ছবি: সুব্রত রায় / সিসি-বাই-এসএ ৪.০

বেশ আগ্রহ ছিল পুল ও টেবিল-টেনিসে অংশ নেয়ার। তবে, অর্থের বিনিময়ে এন্ট্রি ফি বাবদ এ খেলাগুলোয় অংশগ্রহণের আগ্রহ স্তিমিত হয়ে পড়ে। পরে জানলাম তানভির রহমান ভাই ও রকি ভাই পুল খেলেছিলেন। সুইমিংয়ে নামারও ইচ্ছে ছিল। তবে জলে স্পর্শ করা থেকে নিজেকে বিরত রাখিনি। বেশ রঙিনময় ছিল রাতের পরিবেশটি। আড়ালে-আবডালে অবশ্য সিগারেট খাবার কমতি ছিল না। একটিমাত্র ঘটনা ছাড়া রিসোর্টের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভূমিকা ছিল বেশ প্রশংসনীয় ও অভিজ্ঞতায় পরিপূর্ণ। রাতের বেলায় উপলব্ধি করি যে, আগামীকাল অর্থাৎ শনিবারই শেষ দিন। পরদিন রবিবার সকলকেই চলে যেতে হবে। রুমে বাবুল বৈশ্য আমায় চা তৈরি করে খাওয়ান। পরদিন অবশ্য আমিও তাঁকে চা তৈরি করে খাওয়াই। ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলায় তাঁর আন্তরিকতা বেশ ভালো লেগেছিল। তবে, সবচেয়ে অধিক ভালো লেগেছিল প্রণামিকা অধিকারী’র অনুষ্ঠানে আন্তরিকতাপূর্ণ কথোপকথন। 

দ্বিতীয় দিনও বেশ ব্যস্ততায় কাটে। তবে, প্রথম দিনের তুলনায় চাপ কিছুটা কম। আদতে, আমরা কেউ-ই বিশ্রামে ছিলাম না। কোন না কোন অবস্থায় প্রত্যেকেরই কম-বেশী ভূমিকা ছিল সম্মেলন অনুষ্ঠানকে স্বার্থক করে তুলতে। দুপুরের অধিবেশনের পর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক জনাব মামুন অর রশীদ সাহেবের চমৎকার, জ্ঞানগর্ভ উপস্থাপনার আরও সজীব করে তোলে। বিদায়ের দিনে প্রণামিকা অধিকারী ও বাবুল বৈশ্য আসামের স্মারক ঐতিহ্য মাথাল ও গামছা বা উত্তরীয় শাবাব মুস্তাফা ও অনুপ সাদি’র কাছে হস্তান্তর করেন সহজাত ভঙ্গীমায়। বিদায়ী অনুষ্ঠানের কিছুটা সময় ভাব-গম্ভীর পরিবেশ ছিল। হয়তোবা আবারও দেখা হবে কিংবা নাও দেখা হতে পারে। এছাড়াও, যাতায়াত বিবরণী দাখিল করতে হয়েছে প্রত্যেককে। সম্প্রদায়ের গ্রুপ ফটো চলতে থাকে। বাংলা উইকিপিডিয়ার ২০তম জন্মবার্ষিকীকে ঘিরে বিশাল আকৃতির কেট কাটা হয়। কেক খাই। এরপর থেকেই বোধহয় পেটে গ্যাস জমতে শুরু করে। 

প্রশাসকগণ। ছবি: সুব্রত রায় /সিসি বাই-এসএ ৪.০, উইকিমিডিয়া কমন্স।

ব্যানারকে ঘিরে উপস্থিত সকল প্রশাসকের গ্রুপ ফটো ধারণ করা হয়। এছাড়াও, সাম্প্রতিককালে প্রশাসকদের উপর অন্যায় অভিযোগের বিষয়কে ঘিরে নিরব প্রতিবাদের অংশ হিসেবে উল্টোমুখী ছবি তোলা হয়। মাঠেও অনেকগুলো ছবি ধারণ করেন মহীন রীয়াদসহ অনেকেই। সন্ধ্যেয় একটু বের হই। চা, সেভেন-আপের দাওয়াত উপেক্ষা করতে পারিনি। তবে, কেবলমাত্র চিনি ছাড়া দুধ চা খাই। মূল ফটকে একত্রে গ্রুপ ফটো পর্বে অংশ নেই। অভ্যর্থনা কক্ষে ব্যাডমিন্টন খেলার আভাষ পাই। টেনিস কোর্টে এমনিতে মঈনুল ইসলামের সাথে জুটি গড়ে স্মারক খেলার উভয়টিতে জয় পাই ও অনানুষ্ঠানিকভাবে চ্যাম্পিয়নের মর্যাদা লাভ করি। উজ্জ্বীবিত মনে খাবার কক্ষে গেলেও কোন রকমে রাতের খাবার গ্রহণ করে রুমে ফিরি। তবে, শারীরিক অবস্থার ক্রমাগত অবনতি হতে থাকে।

মধ্য রাতেও প্রকৃতির টানে ঘুম ভেঙ্গে যায়। ভোর চারটায় ঘুম থেকে উঠে পড়ি মোবাইলের সুমধুর রিংটোনে। সাড়ে চারটায় ইলেকট্রিক হিটারে চা তৈরি করে খাই। সোয়া পাঁচটায় অটোরিক্সায় চড়ি। মাঝখানে ম্যাসেজ কিংবা মোবাইলে ফোন করি। কোনরকমে অবসরপ্রাপ্ত সহকারী অধ্যাপক শশী মোহন সরকার স্যারের বাড়ীতে পৌঁছি সোড়া নয়টায়। সাড়ে নয়টায় কলেজ ক্যাম্পাসে সহজাত ও আন্তরিকতাপূর্ণ দরাজ গলায় ফোন করেন মাসুম আল হাসান রকি। প্রকারান্তরে তা দায়িত্ব পালনের মহান দৃষ্টান্তস্বরূপ। দুপুরে একান্ত ঘনিষ্ঠ কর্ণ বিশ্বাসের মেয়ের বিয়ের উপহার হস্তান্তর করলেও কোন কিছু না খেয়ে চলে আসতে বাধ্য হই। এভাবেই ভালো-মন্দে শেষ হয় আনন্দ ভ্রমণ নামে পরিচিত বাংলা উইকিসম্মেলন যা আজও বেঁচে রয়েছে মনের মণিকোঠায়। তবে, সর্বসাকুল্যে ভালোর দিকই ছিল অধিক যা আয়োজক দল, উপ-দল – প্রত্যেকেরই প্রাণান্তকর ভূমিকায় বেশ নির্বিঘ্নে ও নিশ্চিন্তে শেষ হয়। এ ধরনের সম্মেলন সাংবার্ষিক আয়োজন করা প্রয়োজন। নেতৃত্বের বিকাশ, আত্মবিশ্বাসী মনোভাব আনয়ণ, বুদ্ধিবৃত্তি চর্চায় উজ্জ্বীবনী ভূমিকা, ভালোবাসা ও মমত্ববোধ, দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ পালন, দৃষ্টিভঙ্গীর বহিঃপ্রকাশ, মতামত বিনিময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করি। একদিকে চোখের ভাষায় পরবর্তী করণীয় কি হতে পারে কিংবা দায়িত্বশীলতা বা আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে ইকবাল হোসেনের ভূমিকার বিষয়টিও স্মরণীয় হয়ে থাকবে নিঃসন্দেহে। সর্বোপরী সকলের সহযোগিতায় এ সম্মেলন সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও নিখুঁতভাবে সম্পন্ন হওয়া বাংলা উইকিসম্মেলনের সাথে যুক্ত আয়োজকমণ্ডলীকে অশেষ ধন্যবাদ ব্যক্ত করছি।

উইকিবার্তা
Translate »
Share This