মেহেদী আবেদীন। ছবি: NahidHossain / সিসি-বাই-এসএ ৪.০

১৪ নভেম্বর আনুমানিক বিকেল ৫টা। আমি সবার সাথে ড্রিম স্কোয়ার রিসোর্টের রিসিপশন রুমে। মনে হচ্ছে যেন সাহারা মরুভূমি পাড়ি দিয়ে মাত্র স্বর্গে প্রবেশ করলাম। এত ভীড়ের মধ্যে কে যে উইকিমিডিয়ান আর কে যে উইকিমিডিয়ান নয় সেটাই বলা কঠিন। যদিও দুই একজনকে দেখে চেনা যাচ্ছে। তবে লক্ষ্য করলাম বারটেন্ডারের পোশাক পরিহিত একটি মেয়ে একপাশে ওয়ান টাইম গ্লাসে কিসব কমলা রঙের তরল পদার্থ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। খেতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু এগুলো ফ্রি কিনা সেটাই ভাবছিলাম। একটু পরে খাত্তাব এসে হাজির, আমাদের দুজনকে একই রুমে থাকতে হবে। যেহেতু আমি সবার কাছে বলতে গেলে প্রায় অপরিচিত তাই এটা কোন ইস্যু নয়। খাত্তাবকে জিজ্ঞেস করলাম ওই জুস ফ্রি কিনা। লোকজন অভয় দেওয়ার পরে আমি আমার বিধ্বস্ত দেহ নিয়ে ধীরে ধীরে মেয়েটির দিকে এগিয়ে গেলাম। একটা প্লাস্টিকের গ্লাস নিয়ে খেয়ে ফেললাম আর আমার মুখটা বেজার হয়ে গেল। ভেবেছিলাম ম্যাঙ্গো জুস বা অরেঞ্জ জুস টাইপের কিছু হবে। কিন্তু আমার অনুমান সব ভণ্ডুল করে দিয়ে তা পেঁপের রস হয়ে আমার জিভে স্বাদ জানান দিল। পেঁপের রস আমার খুব পছন্দ নয়, তারপরে আবার সেটা ছিল পানসে। একটু চিনি দিলে হয়তো ভালো লাগত। যাই হোক, কি আর করার! খাত্তাব আর আমি চলে গেলাম রুমের দিকে। একটা ব্যাটারি চালিত গাড়ি আমাদের রুমের দিকে নিয়ে গেলো। রুম নম্বর ১১৯। রুমে গিয়ে ব্যাগ থেকে সবকিছু বের করে গুছিয়ে বিছানায় শুয়ে রইলাম। বিছানাটা খুব নরম, একটু নড়লেই লাফিয়ে উঠে। বিছানাটা আমাকে মনে করিয়ে দিলো মিস্টার বিনের হোটেল রুমে থাকার সেই এপিসোড। কখন খাবো ভাবছি। ভালোই খিদে লেগেছে, খাত্তাব একটু পরে এলো। তারপর আমরা রাত সাড়ে আটটার দিকে চলে গেলাম স্পাইস রেস্টুরেন্টে। সেখানেই নাকি আমাদের খাবারের ব্যবস্থা হবে।

মেহেদী আবেদীন ও খাত্তাব (ডানে)। ছবি: Md Joni Hossain / সিসি-বাই-এসএ ৪.০

রেস্টুরেন্টে গিয়ে তো আমি অবাক। ভেবেছিলাম এখানে কিছু নির্দিষ্ট আইটেম থাকবে। কিন্তু এটা তো একটা ব্যুফে! নিজের ইচ্ছামত আইটেম নেওয়া যায় খাওয়ার জন্য! সবজি থেকে শুরু করে এখানে পোলাও, ফ্রাইড রাইস, চিকেন, বিফ, মাটন সব আছে। বাহারি খাবারের পসরা সাজিয়ে রেখেছে এরা! আমি তো কোনটা রেখে কোনটা খাবো বুঝতে পারছিনা। প্রথমে দেখলাম এক পাশে আছে ফ্রাইড রাইস, কিন্তু দেখলাম ফ্রাইড রাইসে সবজির পরিমাণ একটু বেশি। আমি আবার ভাবলাম যখন ফ্রিতে খাবো তখন শুধু শুধু সবজি নেওয়ার প্রয়োজন কি। নিয়ে নিলাম পোলাওয়ের সাথে মুরগির ভাজা রান। সাথে নিলাম কয়েক টুকরা নান। বুঝে দেখুন চেখে দেখলে কত মজাই না হবে। পেট ভরে খেয়ে নিলাম। খাওয়ার পরেই শুনলাম এক পাশে নাকি ডেজার্ট ছিল, কিন্তু আমি যে পেট পুরে খেয়ে নিয়েছি। ডেজার্ট নিতে না পারায় আমার মনটা খারাপ হয়ে গেলো। কিন্তু চিন্তা কি, আরও দুই দিন তো থাকতে পারবো। তখন জমিয়ে ডেজার্ট খাওয়া যাবে… আসলে ভেন্যুতে থাকাকালে এত রকমের খাবার খেয়েছি যে কোন বেলায় কী কী আইটেম নিয়েছিলাম সেগুলো স্পষ্ট করে মনে করা কঠিন। এদের আইটেম সাজানোর ধরনটা একটু অদ্ভুত। এরা একেক বেলায় ভিন্ন ভিন্ন আইটেম নিয়ে হাজির হয়। মূলত ব্যুফেতে খেয়েছি নিয়মিত ৩ বেলা করে। আর রিসোর্ট রুমে ফ্রি কফির ব্যবস্থা তো ছিলোই। বুঝুন অবস্থা, এমন একটা জায়গায় গিয়ে কেউ ৩ দিন খাওয়াদাওয়া করলে সে পেট ফুলিয়ে বের হবে।

কিন্তু আজব ব্যাপার হলো আমার ক্ষেত্রে উল্টোটাই ঘটেছে। বের হয়েছি ফোলা পেট নিয়ে, কিন্তু এত যে খেলাম তবুও ফেরার পর বাসায় গিয়ে দেখি পেটটা কমে গেছে! হিসেব করে দেখলাম যে ভেন্যুতে ৩ দিন থাকাকালে আমাকে নিয়মিত ৭০ মিনিট হাঁটতে হয়েছে, হয়তো এই কারণেই। নান আর পরোটার আইটেমগুলো এক কথায় ঝাক্কাস, তবে দুটো আইটেম একসাথে দেওয়া হত না। কখনো পরোটা, আবার কখনো নান। নানের সাথে ভাজা মুরগি তো মজাই মজা। তবে ভালো লেগেছে পরোটা দিয়ে মাটন। এটা খেয়েছিলাম যেদিন রিসোর্ট থেকে বাসায় ফিরবো সেদিন সকালে। মাটনের দাম এমনিতে বেশি তাই খাওয়া হয়না। প্রথমবার যখন মাটনের টুকরোটা পরোটায় জড়িয়ে রসে ভিজিয়ে খেলাম তখন মনে হল আমার মন বলছে “খা, আরও খা, আরও বেশি করে খা”। কিন্তু আমাকে স্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করতে হয়। এটা ঠিক যে জগতে অনেক মজার মজার খাবার আছে। কিন্তু সবসময় আসলে মজার মজার খাবার খাওয়া যায়না তা আমি সম্মেলনে এসে টের পেয়েছি। সর্বভুক হলেও আমাদের ডায়েট দরকার হয়। আর সেজন্য আমরা সবজিও সাথে খেয়ে থাকি। নিজেদের প্রয়োজনে আমাদের কখনো বাঘের মতো মাংস খেতে হয়, আবার কখনো আমাদের হরিণের মতো সবজি খেতে হয়।

সবচেয়ে ভালো লেগেছে মানুষ আমাকে খাওয়ার সময় যেভাবে সাহায্য করেছে তা দেখে। যেমন সম্মেলন শুরু হওয়ার আগের রাতে রেস্টুরেন্টে বাংলা উইকিপিডিয়ার প্রশাসক ইয়াহিয়া এসে জিজ্ঞেস করলেন খাবার কেমন হয়েছে। খুব বেশি ঝাল ছিল কিনা (ঝাল খাবারে সেন্সিটিভিটি আছে)। এলার্জিতে ভুগতে হচ্ছে কিনা (পেঁয়াজে এলার্জি আছে)। ভাগ্যিস এরা খাবারে খুব ঝাল দেয়না। পেঁয়াজ বাবাজিকেও দেখা যায়নি, সম্ভবত এরা পেঁয়াজ ছাড়া রান্নার বিশেষ পদ্ধতি জানে। তবে দায়িত্বের খাতিরে হলেও ইয়াহিয়ার এই ব্যাপারটা ভালো লাগলো। আবার যেমন আরেক বেলায় (সম্ভবত দুপুরে) খাবারের পসরা দেখে ভাবছি ফ্রাইড রাইস নিলে কেমন হয়। পাশে সম্মেলনে আসা একজন উইকিমিডিয়ানকে আইটেমের ব্যাপারে প্রশ্ন করতে বললেন যে তিনি একবার ফ্রাইড রাইস নিয়ে ঠকেছিলেন। তিনি আমাকে বললেন অল্প পরিমাণে নিয়ে দেখতে, অবশ্য পরে দেখা গেলো ফ্রাইড রাইসটা ঠিকই আছে। তখন তিনি বলেছিলেন যে আজকের ফ্রাইড রাইসটা ঠিক আছে। আসলে মনে হয় আগেরবার ফ্রাইড রাইস ঠান্ডা হয়ে যাওয়ায় স্বাদ নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো। সেই উইকিমিডিয়ানের নামটা আর জানা হয়নি, চেহারাটাও অজানা কারণে ভুলে গেছি। তিনি যদি আমার লেখাটা পড়ে থাকেন তাহলে আমার আলাপ পাতায় নিজের পরিচয় জানাতে ভুলবেন না। আবার যেমন আরেক বেলায় আমি ভাবলাম একটু এক্সপেরিমেন্ট করি। একটু পাস্তা নিলাম। পরে ভাবলাম আরও পাস্তা নিয়ে নিই প্লেটে। আর তখনই দোলন প্রভা আপু এসে পাস্তার ব্যাপারে সাবধান করে দিলেন। বলে দিলেন পাস্তাটা নাকি খুব একটা ভালো না। আমি তখন আর বেশি পাস্তা নিলাম না।

সব আইটেম খাওয়ার পর যখন পাস্তা খেতে নিলাম তখন খেয়াল করলাম আমার শরীর আমাকে বলছে “এসব খাবার বাদ দে!” এই বলেই আমার শরীরের ভেতর থেকে হজম করা পাস্তা বের করে দেওয়ার চেষ্টা করলো। তখন আক্ষেপের সাথে ভাবতে লাগলাম “হায়রে ওই আপুই তাহলে ঠিক ছিলো”। প্রতি বেলায় নতুন নতুন আইটেম। কিছু আইটেম চেনা, আবার কিছু আইটেম অচেনা। যেমন ডেজার্টের কথা ধরা যাক, প্রথমবার খেয়েছিলাম সেমাই আর ক্রিম দিয়ে তৈরি হালুয়ার আকৃতির একটি ডেজার্ট। খেয়ে মনে হচ্ছিল যেন কাঁচা বনফুল সেমাই খাচ্ছি। কিন্তু ভালোই লাগছিল। বাসে উঠার আগে খেয়েছিলাম কালোজাম। খাওয়ার সাথে সাথেই আমার ছোটবেলার কথা মনে পড়ে গেল। ছোটবেলায় আমি যে কত কালোজাম খেয়েছি। জেলি আসলে ডেজার্টের পর্যায়ে পড়েনা। কিন্তু জেলির সাথে পাউরুটি খাওয়ার সময় বুঝেছিলাম জেলি ওরা নিজ হাতে বানিয়েছে। সবচেয়ে অবাক হয়েছিলাম যখন আইটেমগুলোর মধ্যে সিঙ্গাপুরি চিকেন নাকি কি যেন নামের একটা আইটেম দেখেছিলাম। এমনিতেই মাংসের আইটেম আমার প্রিয়, তাও আবার নতুন আইটেম, প্লেটে তুলে বসে ছুরি দিয়ে কাঁটতে শুরু করলাম। কিন্তু খেয়াল করছি যতই জোর দিয়ে কাটার চেষ্টা করিনা কেন মাংসের টুকরোগুলো কিছুতেই আলাদা করা যাচ্ছেনা।

সিঙ্গাপুরি চিকেনের আইটেমটা। ছবি: শাকিল / সিসি-বাই-এসএ ৪.০

পরে খেয়াল করলাম যে আমি উত্তেজনার চোটে ছুড়ির ধার উল্টোদিকে ধরেছিলাম। খেয়ে দেখলাম – একদম চমৎকার! ফার্স্টক্লাস!! অপূর্ব!!! মোহনীয়!!!! এরকম আইটেমই তো ব্যুফেতে থাকা চাই। তবে পরিচিত আইটেমগুলোও কম নয়। এক বেলায় দিলো আমার পছন্দের কোরমা। পোলাওয়ের সাথে খাওয়ার পর মনে হলো যেন বাড়ির খাবার খাচ্ছি। অনেক সময় কিছু আইটেম অতিসাধারণ হলেও ভালো লাগে। যেমন এদের বুটের ডালের আইটেমটা, লুচির সাথে খেয়ে জব্বর লেগেছে। খেয়ে মনেই হয়নি নিরামিষ খাচ্ছি। অনেকটা ডালের সাথে মাংসের রস মিশিয়ে দিলে যে স্বাদটা পাওয়া যায় আমার কাছে কিন্তু সেরকম সুস্বাদু লেগেছে (নিরামিষভোজীদের চমকে উঠার কিছু নেই। ওটা সম্পূর্ণ নিরামিষ আইটেম। কিন্তু আমার কাছে ভালো লেগেছে বিধায় এভাবে প্রকাশ করেছি)। ফিশ অ্যান্ড চিপস খেয়ে নিজেকে ব্রিটিশ মনে হচ্ছিল। ৩ দিনে রেস্টুরেন্টের ওয়েটারগুলো আমাকে চিনে ফেলেছিল। প্রবেশ করলেই সালাম দিয়েছে, প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেছে। রেস্টুরেন্টে খাওয়ার সময় ইয়া লম্বা একটা সাদা টুপি পরে এক শেফকে ঘুরতে দেখা যেত। তখন তাকে যেন সেই রেস্টুরেন্ট সাম্রাজ্যের নেবুচাদনেজার মনে হত।

উইকিসম্মেলনের মতো বড় কোন অনুষ্ঠানে একজনকে অনেকক্ষণ সময় দিতে হবে সেটাই স্বাভাবিক। সেজন্য শরীরে দরকার শক্তি যা পেতে বেশি বেশি খেতে হবে। আর খাবার যদি খুব মজাদার হয় তাহলে তো আর কথাই নেই, কিন্তু এসবের পাশাপাশি আরেকটা বড় ব্যাপার আছে – ঘুম। আপনি যতই খাওয়াদাওয়া আর বিশ্রাম নিন না কেন, যদি পর্যাপ্ত সময়ের জন্য ঘুমাতে না পারেন তাহলে হয়তো অনুষ্ঠান চলাকালে বেহুশ হয়ে ঘুমিয়ে যেতে পারেন। সম্মেলনে এসেছিলাম সবার কাজ দেখতে ও তাদের মতামত শুনতে। কিন্তু সম্মেলনের ৩ দিন যেহেতু ঘুম পুরোপুরি হয়নি তাই আমার হলে ঘুমিয়ে পড়ার বড় রকমের সম্ভাবনা ছিল। ১৫ তারিখ ছিল সম্মেলনের প্রথম দিন। সম্মেলনে সবার কথা শুনছি কিন্তু মনে হচ্ছে যেন ঘুম ঘুম পাচ্ছে। তখনই শুনলাম হালকা খাওয়াদাওয়ার জন্য আমাদের সময় দেওয়া হয়েছে। আমাদের সম্মেলন হতো হলের দ্বিতীয় তলায়, আর নিচ তলায় আছে একটা রেস্টুরেন্ট।

তো সেখানেই আমরা গিয়ে দুই দিন দুইবার করে খেয়ে নিতাম। একবার সম্ভবত সকাল সাড়ে ১১টায়, আর আরেকবার সম্মেলন শেষে বিকেল ৫ টার পর হবে। তো যখনই সম্মেলনের প্রথম দিন ঘুম ঘুম ভাব নিয়ে খাবার খেয়ে নিলাম তখনই দেখি চোখ থেকে ঘুম উবে গেলো। একেক বেলায় এরা একেক রকমের নাস্তা দিতো। সবসময়ই চা ও কফি অবশ্যই থাকতো। আর চা-কফির সাথে কিছু না কিছু দিতো। যেমন একবার চায়ের সাথে নিয়েছিলাম বিস্কুট আর কেক। এরপর কফির সাথে সবজি রোল। তারপর আবার কফির সাথে চিকেন স্যান্ডউইচ। তারপর আবার চায়ের সাথে চকলেট রোল। একবার সম্ভবত সসেজ রোলও দিয়েছিলো। মানে বাইরে থেকে মনে হবে ছোট সাইজের চিকেন রোল, কিন্তু এর ভেতরে চিকেন সসেজ ভরে দিয়েছে! যখনই এই হাল্কা খাবারগুলো খেতাম তখনই ঘুম বিদায় নিতো আর সেশনে ভালো মনযোগ রাখতে পারতাম। হালকা খাবারের মধ্যে চিকেন স্যান্ডউইচকে আমি এগিয়ে রাখবো, যদিও স্যান্ডউইচ আমার খুব অপছন্দের বস্তু। মানে ভেবে দেখুন, জাস্ট দুটো পাউরুটির টুকরোর মধ্যে সবজি বা মাংস দিয়ে বিক্রি করে রেস্টুরেন্টে! যাই হোক, তবুও স্যান্ডউইচ মজা হয়েছে এটা আমাকে স্বীকার করে নিতেই হবে।

এখন পাঠকসমাজ প্রশ্ন করতেই পারেন যে আমি কি শুধু ভেন্যুতে ওই খাওয়াদাওয়া, ঘুম, হাঁটাহাঁটি ছাড়া আর কিছু করেছি কিনা। কেননা এই লেখায় এসব ছাড়া অন্য কিছুর অস্তিত্ব তেমন দেখা যাচ্ছেনা। অবশ্যই না, এসব ছাড়াও আরও অনেক কিছু আমি করেছি। যেমন অন্যান্য উইকিমিডিয়ানদের সাথে পরিচিত হওয়া, তাদের সাথে গঠনমূলক আলোচনা ও আড্ডা দেওয়া। আর সেগুলোর সাথে সেশনের কাজগুলো তো ছিলোই। অনেকেই বিভিন্ন সেশন নিয়ে এসেছিলেন। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে শ্রীমতি সুজাতা দিদি বাংলা উইকিপিডিয়ায় অনুবাদের সময় করা ভুলগুলো নিয়ে একটা সেশন করলেন। আমি মনোযোগ দিয়ে সেই সেশন দেখার পর বুঝলাম সেশনে দেখানো উদাহরণের মতো কিছু ভুল আমিও মাঝেমধ্যে করে থাকি। আরেকজন আসলেন আসাম থেকে, একজন ভদ্রমহিলা। উনারা সবাই সম্ভবত বয়সে আমার মায়ের সমান বা একটু ছোট হতে পারেন। কিন্তু আমি সেদিন চমকে গিয়েছিলাম অসমীয়া হতে আগত বোনের (নামটা ভুলে যাওয়ার জন্য ক্ষমা করে দিবেন) মুখে বাংলা শুনে! মানে অনেক বাংলাদেশীও আছেন যারা উনার মতো এত ভালো বাংলা বলতে পারেন না। হিমালয়কন্যা নেপাল থেকেও হিমাল সুবেদি নামক একজন দাজু এসেছিলেন। আরও চমকে গেলাম উনার মুখে “আমি বাংলায় গান গাই” গানটা শুনে! চমকের পর চমক আমাকে বাকহারা করে দিলো!!

কিন্তু আরও অবাক হয়েছিলাম প্রায় মায়ের বয়সী দুজন দিদির উইকিমিডিয়ায় অবদান রাখার অদম্য ইচ্ছাশক্তি দেখে। ব্যাপারটা আসলেই প্রশংসনীয়। আমি সম্মেলনে এমন একটা পরিবেশে এসে উপস্থিত হলাম যেখানে একজন নেপালি মোটামুটি আর একজন অসমীয়া ভালো বাংলা পারেন, অন্যদিকে আমি অসমীয়া বা নেপালী তো দূরের কথা হিন্দি বা উর্দু ভাষাতেও ক অক্ষর গোমাংস। জনাব মারুফের চেকমেট নিয়ে করা সেশন না দেখলে জানতামই না যে চেকমেট নামক এরকম একটি কাজের জিনিস ডেভেলপ করা হচ্ছে। জনাব ঐশিকের উইকিউপাত্তে লেক্সিমের উপর নেওয়া সেশন দেখে বুঝলাম টপিকটা গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সেশন দেখার ইচ্ছা ছিল কিন্তু শিডিউল সমস্যার কারণে দেখা সম্ভব হয়নি। হয়তো সেগুলো ইউটিউবে পাওয়া যাবে। কিন্তু সামনাসামনি সেশন দেখার যে মজা আছে সেটা আপনি অনলাইনে পাবেন কোথায়? সম্মেলনের বাইরে আড্ডা দিতে ভালো লাগত। তবে তার চেয়েও ভালো লাগত মাঝেমধ্যে খাবারের টেবিলে বসে উইকিপিডিয়ানদের সাথে আলোচনা করতে। তবে দাগ কেটেছিল শ্রদ্ধেয় উইকিপিডিয়ান ফয়জুল স্যারের সাথে একই টেবিলে বসে ইতিহাস নিয়ে আলোচনা। এমনিতে রিসোর্ট রুমে খাত্তাবের সাথে মাঝেমধ্যে রাজনীতি নিয়ে বিতর্ক তো হতোই। কিন্তু আমার মনে হয় ইতিহাস নিয়ে আলাপ করার জন্য মানুষ এই দেশে কম আছে।

ফয়জুল লতিফ চৌধুরী স্যারের কাছ থেকে মেহেদী আবেদীনের পুরস্কার গ্রহণ । ছবি: মাসুম আল হাসান রকি / সিসি-বাই-এসএ ৪.০

এভাবেই কেটেছে আমার উইকিসম্মেলনের দিনগুলো। টিভিতে ব্রক লেসনার নামক একজন রেসলারের মারামারি এককালে খুব দেখতাম। তার স্লোগান ছিল: ইট, স্লিপ, কনকার, রিপিট। তার স্লোগানের সাথে মিল রেখে নিজের উইকিসম্মেলনের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বলতে হয়: ইট, স্লিপ, কনফারেন্স, রিপিট।

উইকিবার্তা
Translate »
Share This