
হৃষীকেশ সেন, সিসি বাই-এসএ ৪.০ / উইকিমিডিয়া কমন্স
হৃষীকেশ সেন পশ্চিমবঙ্গ সম্প্রদায়ের একজন অভিজ্ঞ উইকিমিডিয়া স্বেচ্ছাসেবক। তিনি এক দশকের ওপর ধরে বিভিন্ন উইকিমিডিয়া প্রকল্পগুলিতে অবদান রেখে চলেছেন। তিনি সাধারণত ইংরেজি ও বাংলা উইকিসংকলন প্রকল্পে বিভিন্ন দুষ্প্রাপ্য বইপত্রের মুদ্রণ সংশোধন এবং উইকিউপাত্ত প্রকল্পে ভারতের আইনকানুন সম্বন্ধে পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে তথ্য সমৃদ্ধ করে থাকেন। জটিল শৈলীর বইগুলির নিখুঁত ভাবে মুদ্রণ সংশোধন করার জন্য তিনি উইকিসংকলন সম্প্রদায়ের মধ্যে খুবই জনপ্রিয়। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ভারতের একটি আধাসামরিক বাহিনীর চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত। সাক্ষাৎকারের প্রশ্নমালা তৈরি করতে সহায়তা করেছেন বোধিসত্ত্ব মণ্ডল। সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন শাবাব মুস্তাফা
উইকিবার্তা: হৃষীকেশদা, আপনাকে উইকিবার্তায় স্বাগতম। উইকিমিডিয়ার সাথে আপনার যাত্রা শুরু হলো কবে থেকে এবং কীভাবে?
হৃষীকেশ: আমি উইকিমিডিয়ায় আসি ২০০৭ সালে, ইংরেজি ও বাংলা উইকিপিডিয়া দিয়ে।
উইকিবার্তা: উইকিসংকলন প্রকল্প সম্পর্কে আপনার আগ্রহ কীভাবে জন্মালো?
হৃষীকেশ: আমার মেঘনাদবধ কাব্যের একটা তুলনামূলক সংস্করণ বানানোর ইচ্ছে হয়েছিল, কারণ মধুসূদন প্রতি সংস্করণে এর পাঠ পাল্টে দিতেন। সেটা একটু বানিয়ে ২০১২ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা উইকিসংকলনে দিয়েছিলাম। পরে বুঝতে পারি এরকম নিজের বানানো জিনিস উইকিসংকলনে দেওয়া যায় না।
উইকিবার্তা: উইকিসংকলনে কাজ করতে গিয়ে আপনার কোন কোন বিষয়ে ভালো লাগা কাজ করে?
হৃষীকেশ: আমার ভাল লাগে এমন সব রচনা, যা কোনো কারণে ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং যেটা করতে নানা রকমের চ্যালেঞ্জ আছে। যেমন আমার পাঠশোধিত প্রথম বাংলা কল্পবিজ্ঞান উপন্যাস সংক্রান্ত “১৫১৩ সাল” কিংবা “জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা” – যার গুরুত্ব বলার অপেক্ষা রাখে না, কিংবা “গৌড়রাজমালা” – যা পুরাতাত্ত্বিক আঙ্গিকে লেখা বাংলার প্রথম ইতিহাস বই, কিংবা “ফুলমণি ও করুণার বিবরণ” – প্রথম বাংলা উপন্যাস।
উইকিবার্তা: এই প্রকল্পে আপনার কয়েকটি সেরা কাজ সম্বন্ধে বলুন।
হৃষীকেশ: বাংলা উইকিসংকলনে আমার সবচেয়ে প্রিয় কাজ “কাদম্বরী”, কারণ তখন বাংলা ওসিআর শৈশবে থাকায় পুরো বইটা নিজে টাইপ করতে হয়েছিল। স্ক্যান থেকে পাঠশোধিত এটা বাংলা উইকিসংকলনের দ্বিতীয় বই। সেরা কাজের মধ্যে হয়ত পড়বে “পাখীর কথা”, “পোকা-মাকড়”, “গৌড়লেখমালা”, রাখাল বন্দ্যোর “বাঙ্গালার ইতিহাস” (১ম) এবং এখন যা করছি, “চর্যাপদ”।
ইংরেজি উইকিসংকলনে
- The Constitution of India (Original Calligraphed and Illuminated Version) – ২০২১ সালে সামগ্রিকভাবে উইকিমিডিয়ার সেরা কাজের মধ্যে উইকিসংকলন থেকে শুধু এটাই উল্লিখিত হয়েছিল, https://wikimediafoundation.org/story/hrishikes-sen/,
- Twenty-four plates illustrative of Hindoo and European Manners in Bengal – এর ছবি উইকিমিডিয়ার ব্লগ পোস্টে জায়গা পেয়েছিল, https://diff.wikimedia.org/2016/07/25/why-i-wikisource/,
- Oriental Scenery – স্ক্যানে অজস্র ছবি, কিন্তু একটাও পাতে দেওয়ার মত ছিল না, ফলে ইন্টারনেটের গহীন জঙ্গলে ছবি শিকারে বেরোতে হয়েছিল,
- জগদীশচন্দ্রের Collected Physical Papers,
- Calcutta: Past and Present,
- The History of the Bengali Language,
- The Pālas of Bengal, এবং
- White Paper on Indian States (1950)।
এখন চলছে Works of Tagore from the Modern Review, 1909-24 – যার পাঠ্যবই হিসেবে প্রকাশিত পাঠের থেকে অনেক আলাদা।
উইকিবার্তা: উইকিসংকলনে বর্তমানে কী কী ধরণের সমস্যা ও ঘাটতি রয়েছে বলে আপনি মনে করেন?
হৃষীকেশ: প্রথম সমস্যা সম্পাদক কম এবং বই প্রচুর। শুধু প্রতিযোগিতার সময় সম্পাদকের সংখ্যা কিছু বাড়ে। দ্বিতীয়ত আমাদের পাঠক সংখ্যাও কম। বেশিরভাগ লোকই চায় বই ডাউনলোড করে অফলাইনে পড়তে। এছাড়া উইকিসংকলনের কাজ বেশ কঠিন। এখানে বইয়ের পাতায় লেখার যেমন বিন্যাস, সেই বিন্যাস বজায় রেখে পাঠশোধন করতে হয়। লেখা অজস্র রকমভাবে সাজানো থাকতে পারে, সেটাকে পরিলিখনের সময় ঠিকভাবে ফুটিয়ে তোলা সহজ কথা নয়। এছাড়াও আছে বই আপলোড, স্ক্যানে সমস্যা থাকলে (পাতা না থাকা বা ছেঁড়া থাকা বা পড়া না যাওয়া) তার মেরামত এবং বহুরকম রক্ষণাবেক্ষণের কাজ। আরেকটা বড় সমস্যা আমাদের পরিলিখিত বইগুলির ডাউনলোড, সম্পূর্ণ বিন্যাস বজায় রাখা।
উইকিবার্তা: এইসব সমস্যা বা ঘাটতি থেকে উত্তরণের সম্ভাব্য উপায়সমূহ কী হতে পারে?
হৃষীকেশ: কিছু আছে সফ্টওয়্যারের সমস্যা বা প্রোগ্রামিং সমস্যা, যেগুলোর ধীরে ধীরে সমাধান হচ্ছে। পাঠকসংখ্যা বাড়াতে গেলে বই ডাউনলোডে উন্নতি ঘটাতে হবে এবং জনমানসে সচেতনতা বাড়াতে হবে। উইকিপিডিয়ার বহু নিবন্ধে সূত্র হিসাবে ব্যবহৃত বই বা প্রবন্ধ উইকিসংকলনে আছে, কাজেই সূত্রে উইকিসংকলনের লিঙ্ক দেওয়াকে প্রাথমিকতা দেওয়া যায় কিনা, তা ভেবে দেখা যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ভিমের পান্টি (https://bn.wikipedia.org/wiki/ভিমের_পান্টি) নিবন্ধে উইকিসংকলনের গরুড়স্তম্ভ-লিপি (https://bn.wikisource.org/wiki/গৌড়লেখমালা_(প্রথম_স্তবক)/গরুড়স্তম্ভ-লিপি) লেখাটিকে উৎকৃষ্ট সূত্র হিসাবে ব্যবহার করা যায়।
উইকিবার্তা: বাংলা উইকিসংকলনের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?
হৃষীকেশ: বাংলা উইকিসংকলন বর্তমানে আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন ভাষার উইকিসংকলনগুলির মধ্যে একেবারে উপরের দিকে আছে। এছাড়া বহু ভবিষ্য-সম্ভাবী নতুন জিনিস এতে কার্যকর করা হয়েছে (যেমন উইকিডাটার সঙ্গে সংযোগস্থাপন, নানা স্বয়ংক্রিয় হালনাগাদ ইত্যাদি), যে জায়গাগুলোতে ইংরেজি কিংবা ফরাসি উইকিসংকলনও পিছিয়ে আছে।
উইকিবার্তা: উইকিসংকলনে কাজ করতে ইচ্ছুক নতুন ব্যবহারকারীদের প্রতি আপনার পরামর্শ কী?
হৃষীকেশ: আমি এটাই বলব যে, একটু আয়াসসাধ্য হলেও উইকিসংকলনে কাজ করলে অনেক কিছু শেখা যায় এবং জানা যায়। শেখার ব্যাপারে অন্যরা সাহায্য করতে সর্বদাই প্রস্তুত। আর জানা? আগে ভাবতাম কুখ্যাত সতীদাহ প্রথার জন্য যেহেতু বেদ ও শাস্ত্রাদির দোহাই দেওয়া হত, কাজেই বেদে নিশ্চয়ই এমন বিধান আছে। ইংরেজি উইকিসংকলনে বঙ্কিমের Vedic Literature (ইংরেজি নিবন্ধ) পাঠশোধনের সময় জানতে পারলাম ঋগ্বেদে মূলে লেখা ছিল “আরোহন্তু জনয়ঃ যোনিমগ্রেঃ”, প্রতিলিপি করার সময় ভুলবশত তা হয়ে যায় “আরোহন্তু জনয়ঃ যোনিমগ্নেঃ” (আজকের ভাষায় ছাপার ভুল)। অগ্র ভুল করে অগ্নি হয়ে যাওয়াতেই আগুনে পোড়ানোর সূত্রপাত। তাই উইকিসংকলনে আসুন, শেখার প্রয়োজন মেটাতে বিভিন্ন সাহায্য পাতা আছে, এছাড়া স্থানীয় সম্প্রদায় তো আছেই। বাংলা বইয়ের ধ্রুপদি ভাণ্ডার নতুনদের অপেক্ষায়।
মুদ্রণ সংশোধন করা হয়নি থেকে প্রাথমিকভাবে কাজ করার জন্য বই বাছতে পারেন।
উইকিবার্তা: আপনার মূল্যবান সময় দিয়ে আমাদের অনুপ্রাণিত করায় আপনাকে ধন্যবাদ।
