উইকিমিডিয়া বাংলাদেশের বার্ষিক সাধারণ সভা ২০১৭।

ছোটবেলা থেকেই বিশ্বকোষজাতীয় বই আমার খুব ভালো লাগতো। স্বপ্ন দেখতাম বড় হয়ে যখন অনেক টাকা হবে তখন এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা কিনবো। যখনকার কথা বলছি সেসময় এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার দাম সম্ভবত ৩-৪ হাজার ডলার ছিল, বাংলাদেশি টাকায় অনেক টাকা! কবে অত টাকা হবে, আর কবে সেই অপেক্ষার শেষ হবে! এরপর পরিচয় হলো মাইক্রোসফটের এনকার্টার সাথে, কিন্তু সেটার আসল কপির দামও বেশ চড়া ছিল। ২০০৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার পর অনেকটা আকস্মিকভাবেই উইকিপিডিয়ার সাথে পরিচয়, পরিচয়ের সাথে সাথেই এর প্রেমে পড়ে গেলাম।

ডায়ালআপ মডেমে টিঅ্যান্ডটির লাইন যুক্ত করে তখন মাত্র কয়েক বছর হয় ইন্টারনেটের সাথে পরিচয় হয়েছে, সেই ইন্টারনেটের সবচেয়ে আকর্ষণীয় জিনিস হয়ে উঠলো উইকিপিডিয়া। যখনই সময় পাই, ঢুকে বিভিন্ন বিষয় পড়তে থাকি, আর আশ্চর্য হয়ে ভাবি, কারা এমন চমৎকার জিনিস বানালো, তাও আবার বিনেপয়সায় দিয়ে দিচ্ছে! কিছুদিন ব্যবহার করার পর জানতে পারলাম উইকিপিডিয়াতে স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে আর-দশজন সাধারণ মানুষের মত স্বেচ্ছাসেবীরাই নিবন্ধ লিখে থাকেন। তখন মনে হলো আমিও লিখি, কিন্তু উইকিপিডিয়ায় কীভাবে লিখতে হয় তা তো জানিনা। অনেকদিন এমন হয়েছে যে, লিখব বলে এডিট বা সম্পাদনা অপশনে ক্লিক করেছি, আবার উইকি সিনট্যাক্স দেখে ঘাবড়ে গেছি; উল্টাপাল্টা কিছু করলে কেউ যদি কিছু বলে সেই ভয়ও ছিল!

এভাবে কয়েক বছর ইংরেজি উইকিপিডিয়া কেবল পড়েছি, মাঝে মাঝে খারাপ লাগতো যে, আমি কিছু করতে পারছি না, কিন্তু উইকি সিনট্যাক্স না জানার কারণে আর সম্পাদনা করা হয়নি। ২০০৫-০৬ সালের দিকে ইংরেজি উইকিপিডিয়ায় ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ করে কীভাবে যেন বাংলা উইকিপিডিয়ায় চলে এলাম! আমার বিস্ময়ের সীমা রইলো না এটা জেনে যে, বাংলা ভাষাতেও একটা উইকিপিডিয়া আছে! বাংলা উইকিপিডিয়ায় সে সময় নিবন্ধ সংখ্যা খুবই কম, মাত্র কয়েক হাজার, সেটা দেখে খারাপও লেগেছিল। পরে ভেবে দেখলাম, বাংলা উইকিপিডিয়াতে যদি আমরা না লিখি তাহলে কারা লিখবে? যেই ভাবনা সেই কাজ, আল্লাহর নাম নিয়ে একদিন সম্পাদনা করতে বসলাম।

আর সবাই যা করে আমিও তেমনি উইকিপিডিয়াতে ভুল দিয়েই শুরু করেছিলাম, আর ভুল করার কিছু সময় পরেই দেখি আমার আইপি অ্যাড্রেসে একটা বার্তা এসেছে। ভুল করার জন্য কেউ একজন আমাকে সতর্ক করেছে, যেহেতু তখনো আমি উইকিপিডিয়ায় নিবন্ধন করিনি, তাই আইপি অ্যাড্রেসে বার্তাটি এসেছে। এটা দেখে আমি ঘাবড়ে গিয়েছিলাম, ভয়ে বেশ কিছুদিন আর উইকিপিডিয়া-মুখো হইনি। পরে ঠিক করলাম আগে সম্পাদনা কীভাবে করতে হয় সেটা শিখবো, তারপর কাজ শুরু করবো। তখন মাত্র কয়েকজন বাংলা উইকিপিডিয়াতে সম্পাদনা করেন, তাদের একটা বড় অংশ বিদেশে থাকেন এবং কাউকেই আমি চিনিনা। তাই বহুদিন শুধু উইকি সিনট্যাক্স খুলে শুধু তাকিয়ে থেকেছি আর বোঝার চেষ্টা করেছি। আস্তে আস্তে সাহস হয়েছে – অনেকদিন এভাবে লিখলাম, দেখি আমি সম্পাদনা করলে আর কেউ কিছু বলে না। তখন সাহস করে উইকিপিডিয়াতে অ্যাকাউন্ট খুলে ফেললাম!

২০০৮ খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ উইকিপিডিয়ায় কয়েকজনের সাথে পরিচয় হয়ে যায়, আমরা মাঝে মাঝে দেখা-সাক্ষাৎ করি, আর আলাপ করি কীভাবে বাংলা উইকিপিডিয়ার নিবন্ধ-সংখ্যা বাড়ানো যায়। একটা কথাই ঘুরেফিরে আসে – আরো মানুষ লাগবে, আরো অনেক মানুষকে জানাতে হবে। বুঝলাম কয়েকজনে মিলে কাজ করে নিবন্ধ সংখ্যা খুব বেশি বাড়ানো যাবে না, তাই মানুষকে জানানোর জন্য বেশি সময় দিতে হবে, অনেক মানুষকে যুক্ত করতে হবে।

২০০৯ সালের দিকে জানতে পারলাম উইকিমিডিয়া ফাউন্ডেশনের চ্যাপ্টার আছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে, বিশেষত উইকিমিডিয়া ডয়েচল্যান্ড আর উইকিমিডিয়া ইউকের (উইকিমিডিয়া যুক্তরাজ্য) কথা শুনলাম। তখন সাধ হয়েছিল, আমাদের বাংলাদেশেও একদিন একটা উইকিমিডিয়া চ্যাপ্টার হবে। আশা করেছিলাম বাংলাদেশ চ্যাপ্টার হলে আরো মানুষকে যুক্ত করা সহজ হবে। আমরা না থাকলেও চ্যাপ্টার থাকবে, কাজ বন্ধ হবে না। সেই চিন্তা থেকে ২০১১ সালে আমরা উইকিমিডিয়া বাংলাদেশ চ্যাপ্টার করার জন্য উইকিমিডিয়া ফাউন্ডেশনের অনুমোদন পেয়ে গেলাম। দেশের ভেতরে আমাদের অফলাইন কার্যক্রম বাড়লো, বাইরের উইকিপিডিয়ানদের সাথে যোগাযোগ বাড়লো, উইকিমিডিয়া ফাউন্ডেশনের সাথে যোগাযোগ বাড়লো।

সবকিছুই হলো, কিন্তু আমাদের বাংলা উইকিপিডিয়ার নিবন্ধ সংখ্যা ১ লাখ আর হয় না! এর মধ্যে অনেক ভাষার উইকিপিডিয়া, যাদের নিবন্ধ সংখ্যা বাংলা উইকিপিডিয়ার থেকে কিছুদিন আগেও বেশ কম ছিল, তারা বট ব্যবহার করে ধুম করে নিবন্ধ সংখ্যা বাড়িয়ে লাখের ঘরে করে ফেললো! তা দেখে আমাদেরও লোভ হয়, কিন্তু আমরা লোভ সংবরণ করি। আমরা সিদ্ধান্ত নিই বাংলা উইকিপিডিয়াকে আমরা যত্ন করে গড়ে তুলবো, বট দিয়ে এক-দুই লাইনের নিবন্ধ দিয়ে উইকিপিডিয়া ভরে ফেলবো না। কষ্ট হয় হোক, সময় লাগে লাগুক। আমাদের বিশ্বাস ছিল যখন ইন্টারনেট দেশে আরেকটু সহজলভ্য হবে, তখন অনেকেই আসবেন বাংলা উইকিপিডিয়ার কাজে হাত লাগাতে। আমাদের বাংলা উইকিপিডিয়া নিবন্ধ সংখ্যায় এবং নিবন্ধের গুণগতমানে সমান তালে এগিয়ে যাবে – এই বিশ্বাস আমাদের সবার ছিল।

অবশেষে আমরা ১ লক্ষ নিবন্ধের মাইলফলক স্পর্শ করেছি, এখন সামনে অনেক লক্ষ নিবন্ধের কাজ বাকি আছে। আমি জানি, আমরা সে কাজেও সফল হবো। আমাদের কাজে এখন গতি এসেছে, প্রথম ৫০ হাজার নিবন্ধ করতে যেখানে ১৩ বছর লেগেছিল, পরের ৫০ হাজার নিবন্ধ করতে সেখানে মাত্র ৩ বছর সময় লেগেছে। এখন বাংলা উইকিপিডিয়া কৈশোরে পা দিয়েছে, কৈশোর বড়ই দুরন্ত, বড়ই চঞ্চল। এখন সে ছুটবে, আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখবে, দেশকে বদলে দেবার স্বপ্ন দেখাবে। আমরা সবাই সেই স্বপ্নের সারথী।

Translate »
Share This