উইকিম্যানিয়া ২০১৯ সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীদের দলগত ছবিটি তুলেছেন প্যাট্রিসিয়া ক্যাসটিলো, সিসি-বাই-এসএ ৪.০

গত ১৬-১৮ আগস্ট সুইডেনের স্টকহোম শহরে অনুষ্ঠিত হল বিশ্বজুড়ে উইকিমিডিয়া সম্প্রদায় তথা উইকিপিডিয়া ও এর সহপ্রকল্পের অবদানকারী স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে আয়োজিত বৃহত্তম বার্ষিক সম্মেলন উইকিম্যানিয়া ২০১৯। ২০০৫ খ্রিষ্টাব্দে জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে প্রথম উইকিম্যানিয়া আয়োজিত হয়। এরই ধারাবাহিতায় এবার উইকিমিডিয়া সুইডেন আয়োজন করে সম্মেলনের ১৫তম আসরের।

এবার বাংলাদেশ থেকে নাহিদ সুলতান, আফিফা আফরিন, ইব্রাহিম হোসেন এবং এই প্রতিবেদক পূর্ণবৃত্তি নিয়ে সম্মেলনে অংশ নেন।

সামাজিক কার্যক্রম

সম্মেলনের প্রথম পর্ব। ছবি: ভেসস্কি, সিসি-বাই-এসএ ৪.০

প্রাকসম্মেলনের দুইদিন অর্থাৎ ১৪ ও ১৫ আগস্ট সামাজিক কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়। প্রাকসম্মেলনের প্রথমদিন, অর্থাৎ ১৪ আগস্ট সুইডীয় পার্লামেন্টের সংস্কৃতি পর্ষদের সদস্য পার লোডেনিয়াস সম্মেলনের অংশগ্রহণকারীদের একটা অংশকে পার্লামেন্ট ভ্রমণের আমন্ত্রণ জানান।

আর এর পরদিন অর্থাৎ ১৫ আগস্ট অনুষ্ঠিত হয় ওল্ড টাউন কালচার ক্রল ও এডিটাথন। এর উদ্দেশ্য হল নোবেল পুরস্কার জাদুঘর, ত্রয়োদশ শতকে প্রতিষ্ঠিত গামলা স্তানের প্রাচীনতম ক্যাথেড্রাল স্তুরশির্কান, রাজা-রাণীর আনুষ্ঠানিক বাসভবন স্টকহোম প্রাসাদ বা দ্য রয়েল প্যালেস, মধ্যযুগীয় ইতিহাস নিয়ে স্থাপিত মিউজিয়াম অব মেডিয়েভাল স্টকহোম, কেন্দ্রীয় উদ্যান কুংস্ত্রাগর্ডেন এবং জাতীয় জাদুঘরে যাওয়া।

পরবর্তীতে এসব নিয়ে অনুষ্ঠিত হয় এডিটাথন – অর্থাৎ এই বিষয়গুলো নিয়ে অংশগ্রহণকারীরা উইকিপিডিয়া বা অনুরূপ প্রকল্পগুলোতে লেখেন। এছাড়াও সম্মেলন শেষে ১৯ তারিখ সিভিলসার্ভেন্টের আয়োজনে রিসার্চ সামিট এবং ২০ ও ২১ তারিখ ফিনল্যান্ডের উইকিমিডিয়ানদের আয়োজনে হেলসিঙ্কি শহরে একটি ভ্রমণ কার্যক্রম আয়োজিত হয়।

মূল সম্মেলন

১৬ আগস্ট থেকে স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হয় উইকিম্যানিয়ার মূল সম্মেলন। বিশ্ববিদ্যালয়টির চার নোবেলজয়ীর নামাঙ্কিত চারটি ভবনে সম্মেলনের ১৭টি বিষয়ের বিপুল সংখ্যক আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। এবারকার সম্মেলন বিভিন্ন কারণেই বৈচিত্র্যময় ছিল।

‘ঐক্যবদ্ধভাবে শক্তিশালী: উইকিমিডিয়া, মুক্ত জ্ঞান এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাকে প্রতিপাদ্য রেখে আয়োজিত এবারের সম্মেলন সম্পর্কে উইকিমিডিয়া ফাউন্ডেশনের সিইও ও এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর ক্যাথেরিন মাহের বলেন, ‘এটিই প্রথম কার্বনবিহীন সম্মেলন।’

কারণ, এবারের সম্মেলনে প্রয়োজনীয় প্রায় সব কাগজই পুণঃপ্রক্রিয়াজাত করে প্রাপ্ত কাগজ দিয়ে তৈরি। ব্যবহার করা হয়েছে প্রকৃতিতে মিশে যায় এমন সামগ্রী। এমনকি আমাদের যে পরিচিতি কার্ড দেওয়া হয়েছিল সেটাও বীজ বহন করছে। মাটিতে বপন করে নিয়মিত পানি দিলে সেখান থেকে ফুলগাছ হবে! এটা শুনে সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীরা বিস্মিত হয়!

১৬ তারিখ সন্ধ্যায় সম্মেলনে আগতদের আমন্ত্রণ জানায় স্টকহোম সিটি কাউন্সিল। ঐতিহাসিক ব্লু হলে আয়োজিত হয় অভ্যর্থনা অনুষ্ঠান। এই হলেই প্রতিবছর ১০ ডিসেম্বর নোবেল পুরস্কার অনুষ্ঠানের পর ‘নোবেল ভোজ’ অর্থাৎ পুরস্কার-পরবর্তী বিশাল খাওয়া-দাওয়া অনুষ্ঠিত হয়।

সম্মেলনের শেষ দিনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ছবি: দেরর আভি, সিসি-বাই-এসএ ৪.০

এবারকার সম্মেলনে উইকিম্যানিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক সেশন একসাথে আয়োজিত হয়। আগতরা নিজ নিজ পছন্দ অনুযায়ী অংশ নেন বিভিন্ন সেশনে। প্রতি সেশনেই শেখার অনেক কিছু ছিল, একইসাথে বাংলা উইকি সম্প্রদায়ের বর্তমান কার্যক্রম নিয়েও আলোচনা হয় সবার সাথে।

সম্মেলনে উইকিমিডিয়া বাংলাদেশের পক্ষ থেকে পোস্টার উপস্থাপিত হয়। ভবিষ্যতে মুক্ত জ্ঞানের অবাধ প্রবেশাধিকার তৈরিতে এবং তা পরিবেশসচেতন করতে উইকির ভূমিকা কী হতে পারে তা নিয়ে বিশদভাবে আলোচনা হয় এ সম্মেলনে। একইসাথে অনুষ্ঠিত হয় নানাবিধ আঞ্চলিক বৈঠক।

এশিয়া-ওশেনিয়া বৈঠকে অংশ নেয় বাংলাদেশ থেকে আগতরা। এখানে এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে উইকিমিডিয়ানরা নিজ নিজ কর্মকাণ্ড তুলে ধরেন। পরবর্তীতে কী কী সমন্বিত কার্যক্রম আয়োজিত হতে পারে সে ব্যাপারেও আলোচনা হয় সবার সাথে।

হ্যাকাথন প্রদর্শনী। ছবি: একজন উইকিপিডিয়ান, সিসি-বাই-এসএ ৪.০

সম্মেলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ নীতিমালা। উইকির যেকোনো সম্মেলনে আগাগোড়া এই নীতি সবাইকে মেনে চলতেই হয়। নীতিমালাটি খুবই সহজ: কোনো প্রকার জাতি-ধর্ম-বর্ণ ইত্যাদি বিষয়ে কাউকে কিছুই বলা হবে না। এমনকি এরূপ কোনো ইঙ্গিত পেলেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অংশগ্রহণকারীরা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসেছে, তাদের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, পোশাক-আশাকে ভিন্নতা, ভাষা ও উচ্চারণগত পার্থক্য সম্মেলনে নতুন মাত্রা যোগায়।

তবে উইকি নিয়ে আগ্রহের দিক থেকে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে কোনো তফাত ছিল না। সবার সাথে সবাই নিঃসংকোচে মেশে, আড্ডা দেয়, বন্ধুত্ব হয়, তাদের জীবনযাত্রার সাথে পরিচিত হয়, কাজ নিয়ে কথা বলা – উইকিম্যানিয়া এভাবে সকল প্রকার বাধা পেরিয়ে সীমানাবিহীন এক বৈশ্বিক মিলনমেলায় পরিণত হয়।

দেখতে দেখতে সম্মেলনের বিদায়ঘণ্টা বেজে উঠল। অবশেষে ২০২০ খ্রিস্টাব্দে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে সম্মেলনের পরবর্তী আসরে সবাইকে আমন্ত্রণ জানিয়ে পর্দা নামল উইকিজগতের বৃহত্তম এ বাৎসরিক সম্মেলনের।

উইকিম্যানিয়া ২০১৯-এর শেষ পর্বের ভিডিও দেখুন:

 

Translate »
Share This