৭৯টি দেশ থেকে আসা প্রতিনিধিরা (ছবি: জেসন ক্রুগার, উইকিমিডিয়া ডয়েচল্যান্ডের সৌজন্যে)

গত ২০-২২ এপ্রিল জার্মানির বার্লিন শহরে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল বিশ্বজুড়ে উইকিমিডিয়া আন্দোলনের সাথে যুক্ত উইকিমিডিয়া চ্যাপ্টার, সমমনা সংস্থা, ব্যবহারকারী দল এবং উইকিমিডিয়া ফাউন্ডেশন বোর্ড অব ট্রাস্টি থেকে আসা প্রতিনিধিদের বার্ষিক মিলনমেলা – উইকিমিডিয়া সম্মেলন ২০১৮। এবারকার সম্মেলনে উইকিমিডিয়া বাংলাদেশ থেকে যোগ দেন সাধারণ সম্পাদক নাহিদ সুলতান, পরিকল্পনা ও আউটরীচ পরিচালক এই প্রতিবেদক (অংকন ঘোষ দস্তিদার) এবং অ্যাফিলিয়েশন্স কমিটি থেকে তানভির মোর্শেদ।

উইকিমিডিয়া সম্মেলনের শুরুটা ছিল ২০০৮ সালে, তখন নেদারল্যান্ডের নাইমেগানে প্রথম উইকিমিডিয়ার চ্যাপ্টার মিটআপ অনুষ্ঠিত হয়। এরই সূত্র ধরে পরবর্তীতে ২০০৯ সালে জার্মানির বার্লিন শহরে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম উইকিমিডিয়া সম্মেলন ২০০৯। আর এরই ধারাবাহিকতায় উইকিমিডিয়া ফাউন্ডেশনের সহায়তায় এবং উইকিমিডিয়া ডয়েচল্যান্ডের আয়োজনে বার্ষিক এই সম্মেলনের এবারকার আসর অনুষ্ঠিত হল। আন্তর্জাতিক এই সম্মেলনে এবার ৭৯টি দেশ থেকে ৩০০’রও বেশি প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন।

সম্মেলনের আগের দুইদিন, অর্থাৎ ১৮ আর ১৯ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হয় প্রাক-সম্মেলন। প্রাক-সম্মেলনে মূলত অংশগ্রহণকারীদের অভিজ্ঞতার আলোকে নানাবিধ প্রশিক্ষণ, আলোচনার আয়োজন করা হয়। প্রতিটি সেশনেই প্রতিনিধিরা নিজ নিজ দেশ বা অঞ্চলে তাদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন সবার সাথে। অর্থাৎ নিজ নিজ অঞ্চলে তাদের কার্যক্রম, সমস্যা এবং কিভাবে তার মোকাবেলা করা গেছে সে ব্যাপারে ধারণা প্রদান করেন।

প্রাকসম্মেলন থেকে শুরু করে মূল সম্মেলনেও নানা ধরণের আকর্ষণীয় সেশন ছিল। যেমন ‘কনফ্লিক্ট এনগেজমেন্ট অ্যান্ড গ্রুপ কনসেন্সাস বিল্ডিং’ নামক একটি সেশনে কাল্পনিক কিছু সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে দ্বন্দ্ব নিরসন সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়। টেকনিক্যাল টুলস সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার জন্য পৃথক সেশনের আয়োজন করা হয়, যেন অংশগ্রহণকারীরা আরো সহজভাবে আয়োজনের কাজ করতে পারে। প্রাকসম্মেলনের দুই দিনই মূল্যায়নের ব্যাপার ছিল, যেন পরবর্তীতে এ আয়োজন আরো যথাযথভাবে করা যায়।

রাইস্তাখ বিল্ডিং-এর সামনে, প্রথম দিনের ট্যুরের ছবি। ম্যাটি ব্লুম/সিসি-বাইএসএ৪.০

উইকিমিডিয়া বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ‘উইকি লাভস কনটেস্ট’ নামক পোস্টার ছিল সম্মেলনে। এতে বার্ষিক নানাবিধ আয়োজন সম্পর্কে বলা হয়। উইকিমিডিয়া বাংলাদেশের বিভিন্ন আয়োজনে নারীদের অংশগ্রহণ সকলের দ্বারা বেশ প্রশংসিত হয়।

এরপর ২০ তারিখ শুরু হয় মূল সম্মেলন। এবারকার উইকিমিডিয়া সম্মেলন মূলত তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। আন্দোলনের পন্থা, আন্দোলনের অংশীদারিত্ব, সামর্থ্য গঠন ও শিক্ষণ (মুভমেন্ট স্ট্র্যাটেজি, মুভমেন্ট পার্টনারশিপ এবং ক্যাপাসিটি বিল্ডিং ও লার্নিং)। মুক্ত জ্ঞান হিসেবে উইকিমিডিয়া আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে প্রয়োজনীয় কৌশল, কর্মপন্থা গ্রহণ বিষয়ে এই সম্মেলনে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এবারকার সম্মেলনে বিশেষভাবে আলোচিত হয় জ্ঞানের সমতা (Knowledge Equity) এবং সকল স্তরের কাছে তা সেবা (Knowledge as a service) হিসেবে পৌঁছে দেওয়ার সম্ভাব্য উপায়। এক্ষেত্রে লক্ষ্য ২০৩০ সাল, এর মধ্যে কিভাবে বিভিন্ন স্তরের মানুষের কাছে জ্ঞান যথাযথভাবে পৌঁছে দেওয়া যেতে পারে, সে লক্ষ্যে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ বা সম্ভাবনা ইত্যাদি এ সম্মেলনে গুরুত্ব পায়। তার পাশাপাশি বিভিন্ন স্তরের মানুষ যেন এর সুফল পেতে পারে সে বিষয়ও এ সম্মেলনে আলোচিত হয়। সম্মেলন সম্পর্কে উইকিমিডিয়া ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ক্যাথেরিন মাহের বলেন, “উইকিমিডিয়া সম্মেলন হল একত্রিত হয়ে সম্মিলিতভাবে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করার একটি সুযোগ।”

সম্মেলনে উইকিউপাত্ত বিষয়ে বিভিন্ন সেশন অনুষ্ঠিত হয়। পাশাপাশি চ্যাপ্টার বা ইউজার গ্রুপের আর্থিক বিবরণী বা বাজেট কিভাবে গঠন করা হয় এ বিষয়ক সেশনগুলোতেও নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচিত হয়। শুধুমাত্র স্বেচ্ছাসেবীদের মাধ্যমে কিভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করা যেতে পারে – এ বিষয়ক সেশনটিও বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এখানে উইকিমিডিয়া বাংলাদেশের সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাসেবাভিত্তিক কার্যক্রম বেশ প্রশংসিত হয়।

এছাড়া আঞ্চলিক গ্রুপগুলো নিয়েও একটা সেশন ছিল। এখানে এশীয় আঞ্চলিক মিটআপে এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে আগত উইকিমিডিয়ানেরা নিজ নিজ কর্মকাণ্ড তুলে ধরেন। পরবর্তীতে কী কী সমন্বিত কার্যক্রম আয়োজিত হতে পারে সে ব্যাপারেও আলোচনা হয়।

সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের খাবারের সাথে বাংলাদেশের আমসত্ত্ব। ছবি: ZUFAr/সিসি-বাই-এসএ ৪.০

তবে সম্মেলনের মূল আয়োজনের সমান্তরালে ছিল নানাবিধ সামাজিক অনুষ্ঠান। সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা তাঁদের নিজ নিজ দেশের বিখ্যাত খাবার নিয়ে আসেন। ‘সুইটস অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ নামক এ আয়োজনে ৭৯টি দেশ থেকে আসা নানা ধরণের খাবার সকলেই দারুণ উপভোগ করেন! বাংলাদেশি খাবারের প্রতিনিধি হিসেবে ছিল আমসত্ত্ব।

এছাড়া সম্মেলনের সামাজিক আয়োজনের অংশ হিসেবে ‘সাম সাইটস ট্যুর’ আর ‘ফুল ডে ট্যুর’ ছিল। এতে চেকপয়েন্ট চার্লির কাছে অবস্থিত বার্লিন দেয়ালের চিহ্ন, বার্লিনের পার্লামেন্ট তথা রাইস্তাখ বিল্ডিং, চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেলের কার্যস্থল জার্মান চ্যান্সেলরি, ব্রান্ডেনবার্গ গেইট, টিয়ার গার্টেন, বিশ্বখ্যাত হুমবোল্ট ইউনিভার্সিটিসহ বেশকিছু খ্যাতনামা স্থান ঘুরিয়ে দেখানো হয়। আর এ ট্যুরের শেষে বার্লিন উইকিপিডিয়ানদের পক্ষ থেকে সারপ্রাইজ দেওয়া হয়! সেখানেও উইকিমিডিয়ানদের আড্ডার পাশাপাশি উপস্থিত ছিল আট ধরণের পিৎজা থেকে শুরু করে আরো হরেক রকমের খাবার! 

অবশেষে ২২ এপ্রিল সকলের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত মুক্ত জ্ঞানের পৃথিবী গড়ে তোলার প্রতিজ্ঞার দ্বারা এবারকার সম্মেলনের পর্দা নামে।

Translate »
Share This